মিথ্যা তথ্য দিয়ে ধর্মীয় সম্মানি নিলে ফেরত দিতে হবে টাকা
ভুয়া তথ্য ও জাল কাগজে সম্মানি নিলে অর্থ ফেরত দিতে হবে
মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জায় কর্মরত নির্বাচিত ব্যক্তিদের জন্য সরকার যে সম্মানি চালু করেছে, তা পেতে মিথ্যা তথ্য, জাল কাগজপত্র বা প্রতারণার আশ্রয় নিলে কঠোর পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া সম্মানি বাতিল হওয়ার পাশাপাশি সেই অর্থ ফেরত দিতে হবে। গুরুতর অনিয়ম বা জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুদান শাখা থেকে জারি করা ‘মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের জন্য সম্মানি ও কল্যাণ সহায়তা প্রদান নীতিমালা ২০২৬’-এ সম্মানি প্রদানের পাশাপাশি অনিয়ম প্রতিরোধ, সুবিধাভোগী যাচাই এবং অর্থ ফেরতের বিষয়ে বিস্তারিত বিধান রাখা হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় নীতিমালাটি প্রকাশ করা হয়।
নীতিমালায় কোন কোন পরিস্থিতিতে একজনের সম্মানি বাতিল হতে পারে, তারও উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে নৈতিক স্খলন বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়া, সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত বা পদত্যাগ করা, তথ্য বা কাগজপত্রে জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়া, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা এবং সম্মানিভোগীর মৃত্যু অন্যতম।
কেউ যদি সম্মানি পাওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেন, জাল কাগজপত্র ব্যবহার করেন কিংবা কোনোভাবে প্রতারণা করে সরকারি অর্থ গ্রহণ করেন, তাহলে সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। নীতিমালায় এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারার উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি পাওনা আদায়ের জন্য Public Demands Recovery Act, 1913 অনুযায়ী অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ কোনো তথ্যের ভুল যদি তদন্তে প্রতারণা বা জালিয়াতির পর্যায়ে প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটিকে সাধারণ প্রশাসনিক ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ থাকবে না। অনিয়মের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ ফেরত নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাস্তবে ওই ধর্মীয় উপাসনালয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কেউ কোনো মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার বা গির্জায় বাস্তবে কর্মরত না থেকেও কাগজে-কলমে নিজেকে কর্মরত দেখিয়ে সম্মানি নেওয়ার চেষ্টা করলে তার সুবিধা বাতিল হতে পারে।
একইভাবে কোনো ব্যক্তি যদি সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আর কর্মরত না থাকেন, তাহলে তার নামে সম্মানি চালু রাখার সুযোগ নেই। চাকরি বা দায়িত্বের পরিবর্তন হলে নতুন নির্বাচিত ব্যক্তির তথ্য সরকারি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করে তার নামে সম্মানি চালু করা হবে।
নীতিমালায় অন্য উৎস থেকে নিয়মিত সম্মানি বা ভাতা গ্রহণের বিষয়টিও যাচাইয়ের আওতায় রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, ট্রাস্ট কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প থেকে নিয়মিত একই ধরনের সম্মানি বা ভাতা পেলে তার যোগ্যতা যাচাই করা হবে। বিদেশি কোনো সংস্থা থেকে নিয়মিত সম্মানি বা ভাতা পাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এ ছাড়া সমাজবিরোধী বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সম্মানি বাতিল হতে পারে। নীতিমালায় রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার বিষয়টিও সম্মানি বাতিলের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুয়া সুবিধাভোগী শনাক্ত করতে ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সম্মানিভোগীদের তথ্য Beneficiary Management Information System বা BMIS-এ সংরক্ষণ করা হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, ব্যাংক হিসাব, নিয়োগপত্রসহ প্রয়োজনীয় তথ্যের মাধ্যমে সুবিধাভোগীর পরিচয় ও যোগ্যতা যাচাই করা হবে।
এই ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে একজন ব্যক্তি একাধিক জায়গা থেকে একই ধরনের সুবিধা নিচ্ছেন কি না, সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সত্যিই দায়িত্ব পালন করছেন কি না এবং আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সরকারি নথির সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করার সুযোগ থাকবে। নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আলাদা পরিচিতি নম্বর সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সম্মানি কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ জানানোর সুযোগও রয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি মনে করেন কেউ ভুল তথ্য বা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি সম্মানি নিচ্ছেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিযোগ করা যাবে। ডাকযোগে, অনলাইনে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা বা GRS-এর মাধ্যমে এবং সরাসরি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
শুধু অভিযোগ গ্রহণ করেই বিষয়টি শেষ হবে না। সম্মানি কার্যক্রম তদারকির জন্য মাঠপর্যায়ে যাচাই ও পরিদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে পারবেন। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার পাশাপাশি বার্ষিক বহিঃনিরীক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ফলে সরকারি অর্থ সঠিক ব্যক্তির কাছে যাচ্ছে কি না, তা বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই করার সুযোগ থাকবে।
তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাৎক্ষণিকভাবে সম্মানি বাতিল হবে না। অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই-বাছাই করে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে। কোনো ব্যক্তি কমিটির সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে নির্ধারিত নিয়মে আপিল করার সুযোগও পাবেন। অর্থাৎ সম্মানি বাতিলের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
সরকারের এই নীতিমালার মাধ্যমে ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত নির্বাচিত ব্যক্তিদের জন্য একটি নিয়মতান্ত্রিক আর্থিক সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে আবেদন, কাগজপত্র যাচাই, ডিজিটাল ডাটাবেজ, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, নিরীক্ষা, অভিযোগ ও আপিল—বিভিন্ন স্তরের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তাই সম্মানি পাওয়ার জন্য আবেদনকারীদের সঠিক তথ্য দেওয়া এবং প্রকৃত দায়িত্ব পালনের প্রমাণ উপস্থাপন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যা তথ্য, জাল কাগজপত্র বা প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি সম্মানি নেওয়ার চেষ্টা ধরা পড়লে শুধু সুবিধা হারানো নয়, নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি প্রচলিত আইনে শাস্তির মুখোমুখি হওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
