ক্যানসারের বিরুদ্ধে আশার আলো দেখাচ্ছে যে ভিটামিন

প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০৩ অপরাহ্ণ
ক্যানসারের বিরুদ্ধে আশার আলো দেখাচ্ছে যে ভিটামিন

মস্তিষ্কের ক্যানসার গ্লিওব্লাস্টোমার চিকিৎসায় ভিটামিন বি৩ নিয়ে প্রাথমিক গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।

ভিটামিন বি৩ বা নিয়াসিন শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পরিচিত পুষ্টি উপাদান। তবে এই ভিটামিনই এবার মস্তিষ্কের অন্যতম আক্রমণাত্মক ক্যানসার গ্লিওব্লাস্টোমার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির গবেষকদের প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে উচ্চমাত্রার নিয়াসিন যুক্ত করলে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ক্যানসারের অগ্রগতি ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে।

ছোট পরিসরের এই গবেষণায় প্রথম ২৪ রোগীর ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চিকিৎসা শুরুর ছয় মাস পর ৮২ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসার নতুন করে বাড়েনি। গবেষকদের হিসাবে, আগের গবেষণার তুলনায় এই হার ২৮ শতাংশ বেশি। তবে গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই এই ফলাফলকে গ্লিওব্লাস্টোমার প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বড় পরিসরের গবেষণা এবং আরও বিস্তারিত নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরই এর কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

গ্লিওব্লাস্টোমার চিকিৎসা কেন কঠিন

গ্লিওব্লাস্টোমা প্রাপ্তবয়স্কদের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক মস্তিষ্কের ক্যানসারগুলোর একটি। সাধারণত অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির সমন্বয়ে এর চিকিৎসা করা হয়। অস্ত্রোপচারের সময় যতটা সম্ভব টিউমার অপসারণের চেষ্টা করা হলেও ক্যানসার কোষ আশপাশের সুস্থ মস্তিষ্কের টিস্যুর মধ্যে ছড়িয়ে থাকতে পারে। এ কারণে সব ক্যানসার কোষ পুরোপুরি অপসারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

চিকিৎসার পরও অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসার আবার ফিরে আসতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে গ্লিওব্লাস্টোমার চিকিৎসায় বড় ধরনের অগ্রগতি সীমিত থাকায় নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। সেই গবেষণারই একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে নিয়াসিন।

কেন ভিটামিন বি৩ নিয়ে গবেষণা

ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ধারণা, গ্লিওব্লাস্টোমা শুধু মস্তিষ্কে টিউমার তৈরি করে না, এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করার কথা যেসব রোগপ্রতিরোধী কোষের, সেগুলো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

গবেষকেরা তাই পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছেন, উচ্চমাত্রার নিয়াসিন এসব দুর্বল হয়ে পড়া রোগপ্রতিরোধী কোষকে পুনরায় সক্রিয় করতে পারে কি না। তাঁদের আগের গবেষণায় ইঁদুরের ওপর নিয়াসিন ব্যবহারের পর প্রাণীদের বেঁচে থাকার সময় বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেই ফলের ভিত্তিতেই মানুষের ওপর সম্মিলিত ফেজ-১ ও ফেজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করা হয়।

এই ট্রায়ালে প্রচলিত কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় নিয়াসিন দেওয়া হচ্ছে। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো কতটা মাত্রায় এটি নিরাপদে ব্যবহার করা যায় তা নির্ধারণ করা। পাশাপাশি নিয়াসিন যুক্ত করলে ক্যানসারের অগ্রগতি ঠেকিয়ে রাখার সময় বাড়ে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

২৪ রোগীর ফলাফলে কেন আশার ইঙ্গিত

ক্যানসারের চিকিৎসায় কোনো রোগের অগ্রগতি না বাড়ার সময়কে ‘প্রগ্রেশন-ফ্রি সারভাইভাল’ বলা হয়। বর্তমান গবেষণায় এই বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

গবেষণা শুরুর আগে বিজ্ঞানীরা একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করেছিলেন। পুরোনো গবেষণার তুলনায় ছয় মাসে ক্যানসারের অগ্রগতি ঠেকিয়ে রাখার হার অন্তত ২০ শতাংশ উন্নত না হলে ট্রায়াল বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু প্রথম ২৪ রোগীর ফল সেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ছয় মাস পর ৮২ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসারের অগ্রগতি দেখা যায়নি। গবেষকদের হিসাবে, আগের গবেষণার তুলনায় এই হার ২৮ শতাংশ বেশি।

তবে রোগীর সংখ্যা মাত্র ২৪ হওয়ায় এই ফলকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না গবেষকেরা। কারণ ছোট নমুনার গবেষণায় পাওয়া ফল বড় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একইভাবে কার্যকর হবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এ কারণেই আরও রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

রোগীর অভিজ্ঞতাতেও নতুন আশার ইঙ্গিত

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫৫ বছর বয়সী এডওয়ার্ড ওয়াল্ডনারের ক্ষেত্রেও এই পরীক্ষাটি নতুন আশার সুযোগ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ক্লান্তি ও হাঁটার ধরনে পরিবর্তন দেখা দেওয়ার পর পরীক্ষা করে তাঁর মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ে। পরে জানা যায়, সেটি গ্লিওব্লাস্টোমা।

অস্ত্রোপচারের পর তিনি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এরপর থেকে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে রয়েছেন। চিকিৎসকেরা যখন তাঁর স্ক্যানের ফলকে ‘স্থিতিশীল’ হিসেবে উল্লেখ করেন, তখন সেটি তাঁর জন্য স্বস্তির খবর হয়ে আসে।

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ গ্লোরিয়া রোলদান উর্গোইতি মনে করেন, গ্লিওব্লাস্টোমা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হওয়ায় সম্ভাবনাময় নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তবে এসব পদ্ধতি অবশ্যই কঠোর গবেষণা প্রটোকল এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে হবে।

ভিটামিন বি৩ হলেও নিজের ইচ্ছায় খাওয়া যাবে না

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গা হলো—ভিটামিন বি৩ পরিচিত ও সহজলভ্য হলেও উচ্চমাত্রায় নিয়াসিন গ্রহণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। অতিরিক্ত নিয়াসিন শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিষক্রিয়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

বর্তমান ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে তাই চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট মাত্রা ও নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে নিয়াসিন দেওয়া হচ্ছে। গবেষণার ফল দেখে সাধারণ মানুষ নিজে থেকে উচ্চমাত্রার ভিটামিন বি৩ বা নিয়াসিন গ্রহণ শুরু করলে তা বিপজ্জনক হতে পারে।

অর্থাৎ এই গবেষণা থেকে এখনই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই যে ভিটামিন বি৩ গ্লিওব্লাস্টোমার চিকিৎসা করতে পারে। বরং প্রাথমিক ফলাফলটি একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, যা আরও বড় গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

গবেষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট ৪৮ জন রোগীকে এই ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে গবেষণাটির চূড়ান্ত বিশ্লেষণ করার কথা রয়েছে। সেই ফলাফলেই বোঝা যাবে, প্রাথমিকভাবে দেখা এই আশাব্যঞ্জক ফল আরও বড় পরিসরে কতটা কার্যকর এবং নিরাপদ থাকে।

তাই আপাতত ভিটামিন বি৩কে গ্লিওব্লাস্টোমার নতুন চিকিৎসা হিসেবে নয়, বরং গবেষণাধীন একটি সম্ভাবনাময় পদ্ধতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page