মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশে, ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা

প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৫ অপরাহ্ণ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশে, ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা

বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, গ্যাস সংকট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সার উৎপাদন কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়ছে চাপ।

বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়নে আশঙ্কা করা হয়েছে, সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে চলতি বছর দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকা মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের এই মূল্যায়নটি সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে করা হয়েছে।

জ্বালানি সংকটে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ

বাংলাদেশ এমন এক সময়ে এই সংকটের মুখে পড়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই নানা চাপে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ বেড়েছে।

২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে এ সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন।

বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি

বিশ্বব্যাংকের মতে, চলতি বছর দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থাকবে প্রায় ১০ শতাংশ।

জ্বালানির বাড়তি দাম ধাপে ধাপে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি আরও শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচও বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে।

এলএনজি ও জ্বালানি সরবরাহে চাপ

বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। তবে দেশে গ্যাস উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে।

অন্যদিকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে।

সংকটের কারণে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।

কৃষি খাতেও বাড়ছে ঝুঁকি

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতেও। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত।

সার উৎপাদন ও আমদানিতে সমস্যা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন ছোট কৃষকরা।

দেশে সার উৎপাদনের জন্য গ্যাস প্রয়োজন। এরই মধ্যে ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিকে গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য খাতেও বাড়ছে ব্যয়

জ্বালানি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্য খাতেও। বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়।

দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে। পাশাপাশি হাসপাতালের ৯০ শতাংশের বেশি সরঞ্জাম আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।

কর্মসংস্থান নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও উৎপাদনের সময় কমানো হয়েছে, আবার কোথাও জ্বালানি সংকটে কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে।

তার মতে, কারখানা বন্ধ হওয়া ও শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঘটনাগুলো সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি সংকট তৈরি করছে না, একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, কৃষি, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবায়ও চাপ বাড়াচ্ছে। সংকট দীর্ঘ হলে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page