‘তেলের দাম বেড়েছে’ বলে সবজির দাম কম, ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ কৃষক
বদলগাছী হাটে সবজির ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে নওগাঁর বদলগাছী হাটে বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বেপারিদের বিরুদ্ধে। এতে উৎপাদন খরচের তুলনায় কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় সবজি চাষিরা। মাঠ থেকে হাটে সবজি নিয়ে আসার পর বেপারিদের নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় অনেক কৃষক লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবজি উৎপাদনে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক ও জমি প্রস্তুতসহ বিভিন্ন খাতে কৃষকদের উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। উৎপাদনের পর বাজারে ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও হাটে এসে অনেক সময় সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এনে বেপারিরা সবজির দর কমিয়ে দিচ্ছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ।
বদলগাছী হাটে সবজি নিয়ে আসা কৃষকদের ভাষ্য, ভোর থেকে ক্ষেতের সবজি সংগ্রহ করে তারা হাটে নিয়ে আসেন। এ জন্য শ্রমিকের মজুরি, পরিবহনসহ নানা খরচ বহন করতে হয়। কিন্তু হাটে এসে বেপারিদের কাছে সবজি বিক্রির সময় কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচও অনেক ক্ষেত্রে উঠে আসছে না। ফলে পরিশ্রম করে ফসল ফলিয়েও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে কৃষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ার বিষয়টি বেপারিরা সামনে আনছেন। কিন্তু এর প্রভাবের পুরোটা কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সবজির ক্রয়মূল্য কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
সবজি চাষিরা জানান, একটি ফসল উৎপাদনের জন্য তাদের কয়েক মাস ধরে পরিশ্রম করতে হয়। জমি তৈরি থেকে শুরু করে বীজ বপন, পরিচর্যা, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই অর্থ ব্যয় হয়। সবজি দ্রুত পচনশীল হওয়ায় ক্ষেত থেকে তুলে দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করেও রাখা সম্ভব হয় না। ফলে হাটে নিয়ে আসার পর কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলেও অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়।
কৃষকদের মতে, সবজির বাজারে কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানে একাধিক স্তরের ব্যবসায়ী থাকায় উৎপাদনকারী কৃষক এবং শেষ পর্যায়ের ক্রেতার দামের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। কিন্তু বাজারে সবজির দর নির্ধারণের ক্ষেত্রে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও ন্যায্য লাভের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে কখনো উৎপাদন কম হলে কৃষক যেমন সমস্যায় পড়েন, আবার উৎপাদন বেশি হলেও ন্যায্য দাম না পেলে লোকসানের মুখে পড়তে হয়।
এ অবস্থায় বদলগাছী হাটে সবজি বিক্রি করতে আসা কৃষকদের মধ্যে বাজারদর নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, পরিবহন ব্যয়সহ বাজারের অন্যান্য খরচের বিষয়টি বিবেচনা করা হলেও এর অজুহাতে কৃষকের উৎপাদিত সবজির ক্রয়মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে দেওয়া উচিত নয়। উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে কৃষক যাতে ন্যায্য দাম পান, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদিত সবজির ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা না গেলে আগামীতে অনেক কৃষক সবজি চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে স্থানীয়ভাবে সবজি উৎপাদনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কৃষকের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজন, তেমনি বাজারে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি।
স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করবে এবং সবজি কেনাবেচায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব যেন একতরফাভাবে কৃষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বদলগাছী হাটের এই পরিস্থিতিতে কৃষকের উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং বাজারের চাহিদা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে কৃষক যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি ভোক্তার জন্যও স্থিতিশীল বাজার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
