গুনাহ মাফের এমন আমল যা মাত্র ১ মিনিট লাগে
অল্প সময়ের জিকিরেও রয়েছে সহিহ হাদিসে বর্ণিত বড় ফজিলত।
মানুষ মাত্রই ভুল করে এবং গুনাহ থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা সম্ভব নয়। কখনো জেনে, কখনো না জেনে মানুষ এমন কাজ করে ফেলে যা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়। তবে ইসলামের সৌন্দর্য হলো, গুনাহ করার পরও বান্দার জন্য তাওবা ও আল্লাহর ক্ষমা লাভের দরজা খোলা থাকে। একজন মানুষ যদি আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চায়, তাহলে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।” (সুরা যুমার: ৫৩)।
গুনাহ মাফের জন্য অনেক বড় কোনো কাজ সব সময় প্রয়োজন হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন কিছু ছোট আমল শিখিয়েছেন, যেগুলো অল্প সময়েই করা যায়। এর মধ্যে একটি অত্যন্ত সহজ জিকির হলো “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি”। সহিহ বুখারির হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দিনে ১০০ বার “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” বলবে, তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো বিপুল হয়।
এই জিকিরটির আরবি হলো: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ
বাংলা উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি।
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁরই।
মাত্র দুই-একটি শব্দের এই জিকিরটি একজন মুসলমান দিনের যেকোনো সময় পড়তে পারেন। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—হাদিসে “দিনে ১০০ বার” বলা হয়েছে। তাই এটিকে “এক মিনিটে পড়লেই সব গুনাহ নিশ্চিতভাবে মাফ” হিসেবে প্রচার করা সঠিক নয়। বরং ১০০ বার পড়তে সাধারণত অল্প সময় লাগে এবং এটি একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ দৈনিক আমল। হাদিসে গুনাহ ক্ষমার যে সুসংবাদ এসেছে, সেটিই এর মূল শিক্ষা।
এই জিকিরের অর্থও অত্যন্ত গভীর। “সুবহানাল্লাহ” বলার মাধ্যমে বান্দা ঘোষণা করে যে আল্লাহ সব ধরনের ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে পবিত্র। আর “ওয়া বিহামদিহি” বলার মাধ্যমে সে আল্লাহর প্রশংসা করে। অর্থাৎ অল্প কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর পবিত্রতা ও মহত্ত্ব স্বীকার করে এবং তাঁর প্রশংসা করে। তাই এটি শুধু মুখে উচ্চারণ করার বিষয় নয়; অর্থ বুঝে আন্তরিকতার সঙ্গে পড়া আরও উত্তম।
গুনাহ মাফের বিষয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাওবা। শুধু জিকির পড়ে গুনাহ করতে থাকা এবং গুনাহ থেকে ফিরে আসার কোনো চেষ্টা না করা ইসলামের পূর্ণ শিক্ষা নয়। কোনো ব্যক্তি যদি কোনো গুনাহ করে, তাহলে তার উচিত সেই গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। যদি সেই গুনাহের সঙ্গে অন্য মানুষের অধিকার জড়িত থাকে, তাহলে সম্ভব হলে সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ করা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সাইয়্যিদুল ইস্তিগফারও ক্ষমা প্রার্থনার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি দোয়া। সহিহ বুখারিতে এটিকে “ইস্তিগফারের শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দোয়াটিতে বান্দা আল্লাহকে নিজের রব হিসেবে স্বীকার করে, নিজের গুনাহ স্বীকার করে এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
দোয়াটির আরবি হলো—
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আনতা রব্বি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাতাতু, আউযু বিকা মিন শাররি মা সানাতু, আবুউ লাকা বিনি’মাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবুউ লাকা বিজাম্বি, ফাগফিরলি, ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয-যুনুবা ইল্লা আনতা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আমার রব, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী আপনার অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির ওপর অটল আছি। আমি যা করেছি তার অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আপনি আমার প্রতি যে নিয়ামত দিয়েছেন তা আমি স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহও স্বীকার করছি। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।
সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে সকালে এই দোয়া পড়ে এবং সন্ধ্যার আগে মারা যায়, সে জান্নাতবাসী হবে; আর যে ব্যক্তি রাতে এটি পড়ে এবং সকাল হওয়ার আগে মারা যায়, সেও জান্নাতবাসী হবে। এই ফজিলত বর্ণনার ক্ষেত্রে হাদিসে দৃঢ় বিশ্বাসের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে “মাত্র এক মিনিটে গুনাহ মাফ” শিরোনামটি আকর্ষণীয় হলেও এর অর্থ এই নয় যে একজন মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করতে থাকবে এবং পরে এক মিনিটের জিকির পড়ে সব দায় থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। ইসলাম এমন শিক্ষা দেয় না। ছোট আমলের বড় ফজিলত রয়েছে, কিন্তু গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আন্তরিক তাওবা করাও জরুরি। বিশেষ করে মানুষের হক নষ্ট করা, অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণ করা, প্রতারণা করা কিংবা কারও ওপর জুলুম করার মতো গুনাহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি সহিহ আমল হলো প্রতিটি ফরজ নামাজের পর তাসবিহ, তাহমিদ ও তাকবির পড়া। সহিহ মুসলিমে এসেছে, যে ব্যক্তি প্রতিটি নামাজের পর ৩৩ বার “সুবহানাল্লাহ”, ৩৩ বার “আলহামদুলিল্লাহ” এবং ৩৩ বার “আল্লাহু আকবার” বলবে এবং ১০০ পূর্ণ করতে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির” বলবে, তার গুনাহ ক্ষমা করা হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো হয়।
তাই গুনাহ মাফের জন্য একজন মুসলমানের কাছে সহজ ও নির্ভরযোগ্য পথ হলো আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা, ইস্তিগফার করা, সৎকাজ করা এবং গুনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা। দিনের ব্যস্ততার মাঝেও এক মিনিট সময় বের করে “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” ১০০ বার পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। এটি একটি ছোট আমল হলেও সহিহ হাদিসে এর জন্য বড় ফজিলতের কথা এসেছে।
আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া উচিত নয়। কেউ জীবনে যত ভুলই করে থাকুক, আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার পথ তার জন্য খোলা। তবে তাওবার অর্থ শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়; বরং ভুল কাজ ছেড়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে তা থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় সংকল্প করাও তাওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সবশেষে বলা যায়, গুনাহ মাফের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো ছোট ছোট আমল আমাদের জন্য বড় সুযোগ। প্রতিদিন মাত্র অল্প সময় ব্যয় করে “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” ১০০ বার পড়া যায়। পাশাপাশি নিয়মিত ইস্তিগফার, নামাজ, তাওবা ও সৎকাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা উচিত। মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সফলতা শুধু দুনিয়ার সম্পদ অর্জন নয়; বরং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি অর্জন করাই প্রকৃত সফলতা।
প্রতিদিন সময় করে অন্তত ১০০ বার “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” পড়ার অভ্যাস করুন। সহিহ হাদিসে এই জিকিরের মাধ্যমে গুনাহ ক্ষমার সুসংবাদ এসেছে। তবে এর পাশাপাশি গুনাহ ছেড়ে আন্তরিক তাওবা করা এবং মানুষের হক আদায় করাও জরুরি।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
