ঋণ থেকে মুক্তির জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া কোনটি?
ঋণ থেকে মুক্তির দোয়া
ঋণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। সংসারের প্রয়োজন, ব্যবসায়িক ক্ষতি, চিকিৎসা ব্যয় কিংবা নানা অনিবার্য পরিস্থিতিতে অনেক মানুষ ঋণের মধ্যে পড়ে যান। ঋণ পরিশোধের চিন্তা যখন দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তখন স্বাভাবিক জীবনও অনেকটা কঠিন হয়ে ওঠে। ইসলাম ঋণের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতকে ঋণ থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে শিখিয়েছেন।
ঋণ থেকে মুক্তির জন্য বহুল পরিচিত একটি দোয়া হলো,
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনী বিহালালিকা আন হারামিক, ওয়া আগনিনী বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনার হালাল দ্বারা আমাকে আপনার হারাম থেকে যথেষ্ট করে দিন এবং আপনার অনুগ্রহে আপনি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে আমাকে মুক্ত করে দিন।
এই দোয়াটি হজরত আলী (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত। একজন ব্যক্তি নিজের চুক্তির অর্থ পরিশোধ করতে অক্ষমতার কথা জানালে আলী (রা.) তাকে বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে যে দোয়া শিখিয়েছিলেন, সেটি কি তাকে শেখাবেন? এরপর তিনি এই দোয়াটি শিক্ষা দেন। জামে তিরমিজির বর্ণনায় হাদিসটিকে হাসান বলা হয়েছে।
এই দোয়ার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা রয়েছে। এখানে শুধু ঋণ পরিশোধের জন্য অর্থ চাওয়া হয়নি; বরং আল্লাহর কাছে হালাল উপায়ে প্রয়োজন পূরণের আবেদন করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন মুসলমানের জীবনে আর্থিক সংকট এলেও হারাম উপায়ে অর্থ উপার্জন বা অবৈধ পন্থা গ্রহণ না করে আল্লাহর হালাল রিজিক ও অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করার শিক্ষা রয়েছে।
ঋণের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া রয়েছে। তিনি দুশ্চিন্তা, দুঃখ, অক্ষমতা, অলসতা, কৃপণতা, কাপুরুষতা, ঋণের ভার এবং মানুষের কাছে পরাভূত হওয়া থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন। হাদিসে আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে এই দোয়াটি বারবার করতে শুনেছেন।
দোয়াটি হলো,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাজানি, ওয়াল আজজি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া দালাইদ্দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজাল।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও কাপুরুষতা থেকে, ঋণের ভার এবং মানুষের কাছে পরাভূত হওয়া থেকে।
এই দোয়াটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ঋণ শুধু আর্থিক সমস্যা তৈরি করে না, এর সঙ্গে দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ ও মানুষের কাছে অসহায় হয়ে পড়ার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। তাই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো এই দোয়ায় ঋণের পাশাপাশি সেই সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলো থেকেও আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য দোয়ার পাশাপাশি নিজের ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে আন্তরিক থাকা জরুরি। কারও কাছ থেকে ধার নেওয়ার পর তা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার অংশ। রাসুলুল্লাহ ﷺ ঋণের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং হাদিসে ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
তাই শুধু দোয়া পড়ে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব থেকে বিরত থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়। একজন মানুষকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী আয় বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, ঋণদাতার সঙ্গে দায়িত্বশীলভাবে যোগাযোগ রাখা এবং বৈধ উপায়ে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করতে হবে। দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি বাস্তব উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।
ঋণ থেকে মুক্তির জন্য এই দোয়াগুলো পড়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বা নির্দিষ্ট সময়কে বাধ্যতামূলক মনে করার প্রয়োজন নেই, যদি তার পক্ষে সহিহ দলিল না থাকে। বরং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করা, নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, হালাল রিজিকের চেষ্টা করা এবং ঋণ পরিশোধের দৃঢ় সংকল্প রাখা উচিত।
আর্থিক সংকট যত কঠিনই হোক, একজন মুমিনের জন্য হতাশ হয়ে পড়ার পরিবর্তে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার শিক্ষা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো দোয়াগুলো নিয়মিত পড়ার পাশাপাশি নামাজ, ইস্তিগফার এবং হালাল রিজিকের জন্য চেষ্টা করা যেতে পারে। আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন খুলে বলা এবং তাঁর সাহায্যের ওপর ভরসা রাখা একজন মুমিনের জন্য বড় আশ্রয়।
তাই ঋণের চাপে থাকা কেউ চাইলে আন্তরিকভাবে পড়তে পারেন, “আল্লাহুম্মাকফিনী বিহালালিকা আন হারামিক, ওয়া আগনিনী বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।” একই সঙ্গে পড়তে পারেন ঋণের ভার থেকে আশ্রয় চাওয়ার সেই দোয়া, যা রাসুলুল্লাহ ﷺ নিয়মিত পড়তেন। তবে দোয়ার সঙ্গে ঋণ পরিশোধের বাস্তব চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াও অপরিহার্য। আল্লাহর কাছে হালাল রিজিক, সামর্থ্য এবং ঋণ পরিশোধের তাওফিক চেয়ে ধৈর্য ও ভরসার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়াই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
