রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা সমাধানে এবার বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকা নগরবাসীর ভোগান্তি কমাতে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি সমন্বিত প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন- রাজধানীতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পর এবার শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণেও আসছে এআই প্রযুক্তি
যানজট নিরসনে সরকারের এই বৃহৎ পরিকল্পনায় কী কী থাকছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট মডেল টেকনিক্যাল সাবকমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি বিভিন্ন সুপারিশ অনুমোদন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক লাইট ও স্মার্ট সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হবে। প্রস্তাবিত ১০৫ কিলোমিটার ‘জিরো সিগন্যাল’ করিডোরের বাইরে থাকা সংযোগ সড়কগুলোও এই প্রযুক্তির আওতায় আনা হবে। এর ফলে যানবাহনের চাপ অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, যা যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া দিনের বেলায় রাজধানীতে সব ধরনের কাভার্ডভ্যান ও ভারী ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যস্ত সময়ে ভারী যানবাহনের উপস্থিতি ঢাকার যানজটকে আরও জটিল করে তোলে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব যানবাহনের চলাচল সীমিত করা হলে সড়কে চাপ কমবে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ১০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘জিরো সিগন্যাল’ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ জন্য দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব-পশ্চিম অংশের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন পরিকল্পনাবিদরা।
পরিকল্পনায় রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। একটি একক কর্তৃপক্ষের অধীনে সমন্বিত সিটি বাস সার্ভিস পরিচালনার প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে বাস রুট, সময়সূচি এবং পরিচালনা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তঃজেলা বাসগুলোর রাজধানীতে প্রবেশ সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যাত্রী ওঠানামা ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল করতে নির্দিষ্ট স্থানে আধুনিক বাস স্টপেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া অন্য কোথাও যাত্রী ওঠানামা নিরুৎসাহিত করা হবে। এতে সড়কে হঠাৎ থামা ও যানজট সৃষ্টির প্রবণতা কমতে পারে।
প্রকল্পের আওতায় প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
এছাড়া রিকশা ও অন্যান্য ধীরগতির যানবাহনকে মূল সড়কের পরিবর্তে স্থানীয় বা ফিডার সড়কে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রধান সড়কে যানবাহনের গতি বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে আধুনিক ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, বিভিন্ন সড়কে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) ব্যবস্থা চালু এবং পুরো প্রকল্প তদারকির জন্য একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর যানজট সমস্যার সমাধানে শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত গণপরিবহন এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন। প্রস্তাবিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর তদারকির ওপর। এখন দেখার বিষয়, প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায় এবং নগরবাসী কতটা সুফল পায়।
সূত্র:-Bangla Tribune










