ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’-এর সঙ্গে তুলনা করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের দেওয়া মন্তব্যকে ঘিরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সম্পর্কে এমন মন্তব্যকে ‘অবমাননাকর’ ও ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। একই সঙ্গে অবিলম্বে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তারা কঠোর কর্মসূচিরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
শুক্রবার (২৯ মে) সংগঠনটির আহ্বায়ক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান, যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আবদুস সালাম এবং ড. মো. আবুল কালাম সরকার স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতিতে এ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
আরও পড়ুন- বাংলাদেশি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে পাশে থাকবে জার্মানি
বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়টির মর্যাদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার দীর্ঘ ঐতিহ্যকেও অসম্মান করেছে। শিক্ষকদের মতে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গবেষণা, প্রকাশনা ও একাডেমিক সাফল্যের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও অগ্রগণ্য অবস্থানে রয়েছে।
সাদা দলের নেতারা উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন র্যাংকিংয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিজ্ঞান, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে প্রায় ৫৬টি গবেষণা কেন্দ্র, ব্যুরো ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এর মধ্যে উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র (সিএআরএস) এবং সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র (সিএসএসআর) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকরা প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মানের স্কোপাস এবং ওয়েব অব সায়েন্স ইনডেক্সভুক্ত জার্নালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করছেন। ফলে গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে বাস্তব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন তারা।
সাদা দলের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিমন্ত্রী গবেষণা কার্যক্রমের প্রসঙ্গ টেনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা করেছেন, যা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। এমন তুলনা দেশের প্রাচীনতম ও ঐতিহাসিক এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল বলেও মন্তব্য করা হয়।
শিক্ষক নেতারা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জাতীয় চেতনার অন্যতম ভিত্তি। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য।
তারা আরও বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, নব্বইয়ের গণআন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা কোনো ব্যক্তির মন্তব্য অত্যন্ত হতাশাজনক।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বাঙালির সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্যতম ধারক হিসেবে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ঐতিহ্যও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়েছে। সীমিত বাজেট এবং বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়টির অর্জন আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত।
সাদা দলের নেতারা দাবি করেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো কোচিং সেন্টার” ধরনের মন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং লাখো সাবেক শিক্ষার্থীর অনুভূতিতে আঘাত করেছে। একই সঙ্গে দেশের গৌরবময় ইতিহাসকেও খাটো করা হয়েছে।
তারা অবিলম্বে এই বক্তব্য প্রত্যাহার করে দুঃখ প্রকাশের আহ্বান জানান। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান রক্ষায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আরও কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হবেন বলেও সতর্ক করেন।
এদিকে প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান স্মরণ করে এ ধরনের মন্তব্যের সমালোচনা করছেন।
সূত্র: সাদা দলের যৌথ বিবৃতি
আরও পড়ুন- ক্লাসে উপস্থিতি কম হলেই ফরম পূরণ বন্ধ, কঠোর নির্দেশনা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের








