প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার আগেই কোচিংয়ে ৪০ লাখ শিশু, বাড়ছে উদ্বেগ

reporter
শিক্ষা ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৫:০৩ অপরাহ্ণ
প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার আগেই কোচিংয়ে ৪০ লাখ শিশু, বাড়ছে উদ্বেগ

প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার আগেই কোচিংয়ে ৪০ লাখ শিশু, বাড়ছে উদ্বেগ

সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে ১৬ বছর ধরে চালু থাকা লটারি পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণার পর নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে ভর্তি কোচিং ব্যবসা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বারবার বলছে, ২০২৭ সাল থেকে যে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে তা হবে ‘নামমাত্র’ এবং এর জন্য কোচিংয়ের প্রয়োজন নেই। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দেশের লাখো অভিভাবক ইতিমধ্যেই সন্তানদের ভর্তি কোচিংয়ে পাঠানো শুরু করেছেন।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্কুলজীবন শুরুর আগেই সারা দেশে প্রায় ৪০ লাখ শিশু ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোচিং করছে। কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষার্থীপ্রতি ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নিচ্ছে। সর্বনিম্ন হিসাব ধরলেও এই খাতে অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।

গত ১৬ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এক পরিপত্রে জানায়, বর্তমানে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি লটারির মাধ্যমে হলেও ২০২৭ সাল থেকে নতুন পদ্ধতিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পরে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, ক্যাচমেন্ট এরিয়া এবং ন্যূনতম ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।

গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা এমন হবে না, যার জন্য কোচিং করতে হবে। আমরা চাই না কোনো অভিভাবক সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠান।”

তবে মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, অভিভাবকদের বড় অংশই এই আশ্বাসে আস্থা রাখতে পারছেন না। তাদের আশঙ্কা, ভর্তি পরীক্ষা থাকলে প্রতিযোগিতাও থাকবে। আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কোচিংয়ের বিকল্প নেই।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আদিব হোসেন আগামী বছর ছয় বছর বয়সী ছেলে আদনানকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করাতে চান। তিনি জানান, ভালো স্কুলে সুযোগ পাওয়ার আশায় কয়েক মাস আগে থেকেই সন্তানকে ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি করিয়েছেন।

শুধু প্রথম শ্রেণি নয়, উচ্চতর শ্রেণিতে ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়ার লক্ষ্যেও শিক্ষার্থীদের কোচিংমুখী হতে দেখা যাচ্ছে। ফলে অনেক শিশু নিয়মিত স্কুলের পাশাপাশি কোচিংয়ের দ্বৈত চাপ সামলাতে গিয়ে মানসিক ক্লান্তি ও উদ্বেগে ভুগছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, ভর্তি পরীক্ষাকেন্দ্রিক এই সংস্কৃতি শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি, নম্বরের চাপ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তাদের সৃজনশীলতা ও শেখার আনন্দকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

দেশের শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, লটারি পদ্ধতি চালুর ফলে অতীতে ভর্তি বাণিজ্য, তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আর্থিক লেনদেনের সুযোগ অনেকটাই কমে গিয়েছিল। এখন সেই পুরোনো চিত্র ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে ভর্তি কোচিং সেন্টারের সংখ্যা বেড়েছে। ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর নিশ্চয়তা দিয়ে নানা ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। লিফলেট, ব্যানার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ব্যাপক প্রচারণা।

শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, “লটারি পদ্ধতি ছিল তুলনামূলকভাবে ন্যায়সংগত। এটি বাতিল হওয়ায় আবারও বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ মানুষ ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে নন।”

তিনি আরও বলেন, দেশের সব এলাকায় সমমানের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারলে ভর্তি পরীক্ষাভিত্তিক ব্যবস্থা সচ্ছল ও সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের শিশুদেরই বেশি এগিয়ে দেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হলো সব স্কুলের শিক্ষার মান উন্নয়ন করা। ততদিন পর্যন্ত ভর্তি প্রক্রিয়াকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে কোমলমতি শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ তৈরি না হয় এবং অভিভাবকদের অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা বহন করতে না হয়।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন