চুয়াডাঙ্গায় ৮৯৯ অ্যাম্পুল বুপ্রেনরফাইন মামলায় জালাল মালিথার যাবজ্জীবন

প্রকাশিত: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৪৭ অপরাহ্ণ
চুয়াডাঙ্গায় ৮৯৯ অ্যাম্পুল বুপ্রেনরফাইন মামলায় জালাল মালিথার যাবজ্জীবন

চুয়াডাঙ্গায় ৮৯৯ অ্যাম্পুল বুপ্রেনরফাইন মামলায় যাবজ্জীবন

চুয়াডাঙ্গায় ৮৯৯ অ্যাম্পুল বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন উদ্ধারের মামলায় জালাল মালিথা (৫১) নামে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আরও এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে তাকে। রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে চুয়াডাঙ্গার বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক শিমুল কুমার বিশ্বাস এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

দণ্ডপ্রাপ্ত জালাল মালিথা চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার রেলপাড়া বা কানাপুকুর এলাকার মৃত আলতাফ হোসেন মালিথার ছেলে। প্রায় পাঁচ বছর আগে দায়ের হওয়া একটি মাদক মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে রোববার আদালত এই রায় দেন। মামলাটিতে তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন নিজের দখলে রাখা এবং বিক্রির উদ্দেশ্যে সংরক্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার পর তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

মামলার নথি ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ২৮ মার্চ সন্ধ্যায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার একাডেমি মোড় এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি দল। এ সময় কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গাগামী ‘সোনারতরী এক্সপ্রেস’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালানো হয়। বাসটি একাডেমি মোড়ে থামার পর যাত্রীদের তল্লাশির সময় জালাল মালিথার গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে তাকে আটক করে তল্লাশি করা হয়।

তল্লাশির সময় জালাল মালিথার ডান হাতে থাকা একটি প্লাস্টিকের বাজারের ব্যাগে কাগজের কার্টনের মধ্যে রাখা ৮৯৯ অ্যাম্পুল বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন পাওয়া যায় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি অ্যাম্পুলে ২ মিলিলিটার করে ইনজেকশন ছিল। সে হিসাবে উদ্ধার করা ইনজেকশনের মোট পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৯৮ মিলিলিটার। উদ্ধার হওয়া মাদকের আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭০০ টাকা।

অভিযানের পর ওই দিনই জালাল মালিথার বিরুদ্ধে চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় মামলা করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক আব্দুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলাটি করেন। মামলায় অবৈধভাবে মাদকদ্রব্য নিজের দখলে রাখা এবং বিক্রির উদ্দেশ্যে তা সংরক্ষণের অভিযোগ আনা হয়।

পরে মামলার তদন্তভার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তৎকালীন উপপরিদর্শক সাহারা ইয়াসমিনের ওপর পড়ে। তদন্ত শেষে তিনি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে গড়ায়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেওয়া হয় এবং জব্দ করা মাদকের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার প্রতিবেদনসহ অন্যান্য নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

মামলার বিচারকালে চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয় বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাক্ষীদের বক্তব্য, মামলার নথি এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত জালাল মালিথার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন। এরপর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ে জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে আসামিকে আরও এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মামলায় জব্দ করা মাদকদ্রব্য রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার পর জালাল মালিথাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা অনুযায়ী বিচার শুরুর আগে আসামি যতদিন হাজতে ছিলেন, তা সাজা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মামলার বিচার চলাকালে কারাগারে কাটানো সময় আইন অনুযায়ী তাঁর দণ্ডের মেয়াদের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাঈদ মাহমুদ শামীম রেজা ডালিম বলেন, ৮৯৯ অ্যাম্পুল বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন উদ্ধারের মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জালাল মালিথার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই রায়ের মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি কঠোর বার্তা যাবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই অভিযান থেকে শুরু করে আদালতের রায় পর্যন্ত ঘটনাটির সময়ের ব্যবধান প্রায় পাঁচ বছর। ২০২১ সালে উদ্ধার হওয়া মাদকের মামলার বিচার শেষ হয়েছে ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণ, নথিপত্র পর্যালোচনা ও অন্যান্য আইনি কার্যক্রমের পর আদালত রায় ঘোষণা করেছেন।

বুপ্রেনরফাইন একটি নিয়ন্ত্রিত ওষুধজাতীয় পদার্থ, যা চিকিৎসাক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হলেও অনুমোদন ছাড়া এর সংরক্ষণ, পরিবহন বা বিক্রি আইনগতভাবে দণ্ডনীয় হতে পারে। ফলে বৈধ চিকিৎসা বা সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে বিপুল পরিমাণ বুপ্রেনরফাইন উদ্ধারের ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে মাদকবিরোধী অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

চুয়াডাঙ্গার এই মামলায়ও আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের বিচারিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটেছে। তবে মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান ও সাজা নয়, মাদকদ্রব্যের উৎস, অবৈধ সরবরাহব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে জড়িত সম্ভাব্য চক্র শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মাদকের অবৈধ প্রবাহ বন্ধে এসব বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ২০২১ সালে একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে ৮৯৯ অ্যাম্পুল বুপ্রেনরফাইন উদ্ধারের ঘটনায় পাঁচ বছর পর আদালতের রায় হলো। আদালত জালাল মালিথাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। একই সঙ্গে জব্দ করা মাদকদ্রব্য রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোববারের এই রায়ের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page