বুয়েটের নকশায় চালু হলো দেশের প্রথম আধুনিক ই-রিকশা

প্রকাশিত: 22-05-2026 12:47 PM
বুয়েটের নকশায় দেশের প্রথম ই-রিকশা চালু |

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)–এর নকশায় তৈরি দেশের প্রথম স্ট্যান্ডার্ড ই-রিকশা। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন শহর ও উপজেলায় ব্যাটারিচালিত রিকশা জনপ্রিয় পরিবহন হিসেবে ব্যবহৃত হলেও নিরাপত্তাহীন নকশা, অতিরিক্ত গতি, দুর্বল কাঠামো ও অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে এসব যানবাহন নিয়ে নানা সমালোচনা ছিল। এবার সেই সমস্যার সমাধান দিতে আধুনিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তৈরি নতুন ই-রিকশা নিয়ে এসেছে বুয়েটের গবেষক ও প্রকৌশলীরা।

আরও দেখুনগণপরিবহনে স্বস্তির নতুন অধ্যায়: রাজধানীতে চালু হচ্ছে ৪০০ ইলেকট্রিক বাস

সম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এই ই-রিকশা ইতোমধ্যে প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি নতুন যানবাহন নয়, বরং বাংলাদেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করার একটি বড় উদ্যোগ। বিশেষ করে শহর ও আধা-শহর এলাকায় চলাচলকারী প্রচলিত ব্যাটারিচালিত রিকশার তুলনায় এটি অনেক বেশি টেকসই, নিরাপদ এবং বিদ্যুৎসাশ্রয়ী হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।

বুয়েটের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, ই-রিকশাটির ডিজাইন তৈরি করার সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভারসাম্য ও নিরাপত্তাকে। প্রচলিত অনেক ব্যাটারিচালিত রিকশা হঠাৎ মোড় নেওয়া বা দ্রুত ব্রেক করার সময় সহজেই উল্টে যায়। নতুন এই স্ট্যান্ডার্ড মডেলে উন্নত চ্যাসিস ও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো ব্যবহার করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া গাড়ির ওজন বণ্টন এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত যাত্রী বা চাপেও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

ই-রিকশাটির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর স্পিড কন্ট্রোল প্রযুক্তি। এতে নির্ধারিত গতিসীমা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ স্পিড লিমিটার ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে চালক ইচ্ছা করলেও অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাতে পারবেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে, তার বড় একটি অংশ অতিরিক্ত গতির কারণে হয়ে থাকে। নতুন এই প্রযুক্তি সেই ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এছাড়া এতে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নতমানের ব্যাটারি ও মোটর প্রযুক্তি। কম বিদ্যুৎ খরচে দীর্ঘসময় চলতে সক্ষম এই ই-রিকশায় এমন ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত গরম হওয়া বা আগুন লাগার ঝুঁকি কম থাকে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি থাকায় এটি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও কম চাপ সৃষ্টি করবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

যাত্রীসেবার দিক থেকেও নতুন ই-রিকশাটিকে আধুনিকভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। এতে আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত লেগ স্পেস এবং উন্নত ছাদ কাঠামো রাখা হয়েছে। ফলে যাত্রীরা গরম, বৃষ্টি কিংবা দীর্ঘ পথেও স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পারবেন। চালকের জন্যও উন্নত সিট ও সহজ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা দীর্ঘসময় গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে সুবিধা দেবে।

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে এই ই-রিকশাকে ভবিষ্যতের নগর পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে কোনো ধরনের জ্বালানি তেল ব্যবহার করা হয় না। ফলে ধোঁয়া বা কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। পাশাপাশি শব্দ দূষণও তুলনামূলক কম। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণ কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। সেই দিক থেকে বুয়েটের এই উদ্যোগ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

বাংলাদেশে বর্তমানে লাখ লাখ ই-রিকশা চলাচল করলেও বেশিরভাগ যানই স্থানীয়ভাবে অপরিকল্পিতভাবে তৈরি। অনেক ক্ষেত্রেই নেই নির্দিষ্ট মান নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন বা নিরাপত্তা যাচাই। এর ফলে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে এবং যাত্রী নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। নতুন এই স্ট্যান্ডার্ড ই-রিকশা চালু হলে সেই অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার যদি এই মডেলকে অনুমোদন দিয়ে ধাপে ধাপে সারা দেশে চালু করে, তাহলে ই-রিকশা খাতে একটি বড় পরিবর্তন আসবে। নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ হবে, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে। একই সঙ্গে চালকদের জন্য প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করাও সহজ হবে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি যানবাহনের উন্নয়ন নয়; বরং দেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও একটি উদাহরণ। বুয়েটের মতো দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও নকশায় তৈরি এই ই-রিকশা ভবিষ্যতে দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

শহরের যানজট ও দূষণ কমাতে ছোট আকারের বৈদ্যুতিক যানবাহনের গুরুত্ব বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। ইউরোপ, চীন ও ভারতের মতো দেশেও ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার পরিবহন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও সেই ধারায় আধুনিক ও নিরাপদ ই-রিকশা চালু হলে নগর পরিবহন ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু আধুনিক নকশা তৈরি করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়নও জরুরি। সঠিক নীতিমালা, নিবন্ধন ব্যবস্থা, চার্জিং অবকাঠামো এবং নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে এই প্রকল্প সফল হবে। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

সবমিলিয়ে, বুয়েটের নকশায় তৈরি দেশের প্রথম স্ট্যান্ডার্ড ই-রিকশা বাংলাদেশের গণপরিবহন খাতে নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই নগরব্যবস্থা গড়তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সূত্র: গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য।

আরও পড়ুন-এক চার্জে ২০০ কিমি চলবে আকিজের নতুন ইলেকট্রিক মিনি কার্গো ভ্যান

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

📌 পোস্টটি শেয়ার করুন! 🔥

স্টাফ রিপোর্টার

স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে আমি 'টেক বাংলা নিউজ' (ssitbari.com)-এ নিয়মিত বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক ও আপডেটেড কনটেন্ট প্রকাশ করি। প্রযুক্তি, মোবাইল, গ্যাজেটসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় সহজ ও বোধগম্য ভাষায় পাঠকদের কাছে তুলে ধরা আমার লক্ষ্য। নির্ভরযোগ্য তথ্য, বিশ্লেষণ ও উপকারী টিপসের মাধ্যমে পাঠকদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করি।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now