গাড়ি-বাইকের কাগজপত্র হালনাগাদে শেষ সুযোগ দিয়েছে বিআরটিএ
গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদে শেষ সুযোগ
দেশের গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের মোটরযানের মালিক ও চালকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা নির্ধারণ করেছে সরকার। জরিমানা ছাড়াই মোটরযানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স হালনাগাদ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে আগামী ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল কর ও নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে ফিটনেস, ট্যাক্স-টোকেন, রুট পারমিট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স হালনাগাদ করা যাবে। সরকার এই সময়সীমাকে শেষবারের মতো বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটিএ সংস্থাপন শাখার জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। অর্থ বিভাগের সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে জরিমানা ছাড়া মূল কর ও ফি জমা দিয়ে সব ধরনের মোটরযানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স হালনাগাদের সময়সীমা ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ২৪ আগস্ট প্রকাশিত সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই বর্ধিত সময়সীমা শেষবারের মতো দেওয়া হয়েছে এবং আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এরপর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ ১ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি আবারও জানায়। সেখানে মোটরযান মালিক ও চালকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ করে নেওয়ার অনুরোধ করা হয়। বিআরটিএর বিজ্ঞপ্তিতে ফিটনেস, ট্যাক্স-টোকেন, রুট পারমিটসহ মোটরযানের অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, কোনো গাড়ি বা মোটরসাইকেলের এসব কাগজের মেয়াদ শেষ হয়ে থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় মূল কর ও ফি পরিশোধ করে সেগুলো নিয়মিত করার সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে ২৯ অক্টোবরের পর এই বিশেষ জরিমানা ছাড়ের সুযোগ থাকবে কি না, সে বিষয়ে নতুন কোনো ঘোষণা না এলে বর্তমান সুবিধাকে আর ধরে নেওয়া যাবে না। যেহেতু সরকারি প্রজ্ঞাপনে এটিকে শেষবারের মতো সময়সীমা বৃদ্ধি বলা হয়েছে, তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় কাজ দ্রুত শেষ করার পরামর্শই গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু কাগজপত্র হালনাগাদ নয়, মোটরযান বিক্রির পর মালিকানা পরিবর্তনের বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে বিআরটিএ। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ২১ ধারা অনুযায়ী কোনো মোটরযান বিক্রি হওয়ার পর নতুন মালিকের নামে মালিকানা পরিবর্তন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি বা মোটরসাইকেল বিক্রি হয়ে যাওয়ার পরও সরকারি নথিতে আগের মালিকের নাম থেকে যায়। নতুন মালিক তখন নিজের নামে মালিকানা পরিবর্তন না করেই যানবাহন ব্যবহার করতে থাকেন।
এতে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়তে পারেন গাড়ি বিক্রি করে দেওয়া পুরোনো মালিক। বিআরটিএ জানিয়েছে, সরকারি নথিতে মালিকানা পরিবর্তন না হলে সংশ্লিষ্ট মোটরযানের জন্য নির্ধারিত অগ্রিম আয়কর, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ১৫০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর এবং পরিবেশ সারচার্জের মতো আর্থিক দায় পুরোনো মালিকের ওপর এসে পড়তে পারে। ফলে বাস্তবে গাড়ি বিক্রি করে দিলেও সরকারি রেকর্ডে নাম পরিবর্তন না হলে বিক্রেতাকে পরবর্তীতে অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক ও আইনগত জটিলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
তবে মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে আগের তুলনায় সহজ ও দ্রুত করার কথাও জানিয়েছে বিআরটিএ। বর্তমানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনলাইন সেবা প্ল্যাটফর্মে আবেদন করার পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বিক্রেতার উপস্থিতিতে হ্যান্ড-হেল্ড ডিভাইস ব্যবহার করে বায়োমেট্রিক যাচাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও কাগজপত্র ঠিক থাকলে একই দিনেই মালিকানা পরিবর্তনের কার্যক্রম সম্পন্ন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন মালিকও ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের জন্য প্রয়োজনীয় বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে পারেন।
অর্থাৎ গাড়ি বিক্রি করার পর শুধু টাকা গ্রহণ করে বা কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নামে মালিকানা পরিবর্তন সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো ব্যক্তি ব্যবহৃত গাড়ি বা মোটরসাইকেল কিনলে সেটি নিজের নামে নিবন্ধন ও মালিকানা পরিবর্তনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে কর, দুর্ঘটনা, আইন লঙ্ঘন বা অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতার ক্ষেত্রে পুরোনো মালিকের নাম সামনে আসতে পারে।
এর পাশাপাশি চালকদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কার্যকর করেছে বিআরটিএ। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ড্রাইভিং লাইসেন্সের দোষসূচক বা ডিমেরিট পয়েন্ট কর্তন শুরু হয়েছে। আইনটির ১১(১) ধারা অনুযায়ী প্রতিটি ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২টি পয়েন্ট বরাদ্দ থাকে। কোনো চালক সড়ক পরিবহন আইন বা সংশ্লিষ্ট বিধি লঙ্ঘন করলে অর্থদণ্ড বা কারাদণ্ডের পাশাপাশি তার লাইসেন্স থেকে নির্ধারিত পয়েন্ট কেটে নেওয়া হতে পারে।
এই পয়েন্ট কর্তনের ব্যবস্থা শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ নেই। বিআরটিএ জানিয়েছে, ‘রোড সেফটি পেনাল্টি সিস্টেম’ বা আরএসপিএস অ্যাপের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনকারী চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের ডিমেরিট পয়েন্ট কর্তন করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ৭৫টি ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে মোট ৭৮টি পয়েন্ট কর্তনের তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে।
ট্রাফিক সংকেত অমান্য, নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘন, অবৈধভাবে মোটরযান ব্যবহার, অতিরিক্ত ওজন বহন, অনিরাপদ বা পরিবেশদূষণকারী যানবাহন চালানোসহ বিভিন্ন ধরনের আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ডিমেরিট পয়েন্ট কাটার বিধান রয়েছে। কোনো চালকের ১২টি পয়েন্টই কাটা পড়লে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স অকার্যকর হয়ে যাওয়ার বিধান রয়েছে বলে বিআরটিএ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে বর্তমানে মোটরযান মালিক ও চালকদের জন্য তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, যেসব গাড়ি বা মোটরসাইকেলের ফিটনেস, ট্যাক্স-টোকেন বা রুট পারমিট হালনাগাদ নেই, সেগুলো ২৯ অক্টোবরের মধ্যে জরিমানা ছাড়া নিয়মিত করে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, গাড়ি বিক্রি বা কেনার পর দ্রুত সরকারি নথিতে মালিকানা পরিবর্তন নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, ড্রাইভিং লাইসেন্সে থাকা ডিমেরিট পয়েন্ট যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কাটা না যায়, সে জন্য সড়ক পরিবহন আইন ও ট্রাফিক বিধি মেনে চলা।
বিশেষ করে ২৯ অক্টোবরের সময়সীমাটি এখন মোটরযান মালিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি প্রজ্ঞাপনে এটিকে শেষবারের মতো সময় বৃদ্ধি বলা হয়েছে। ফলে শেষ কয়েক দিনে বিআরটিএ কার্যালয় বা সংশ্লিষ্ট অনলাইন সেবায় চাপ বাড়তে পারে এবং তখন সেবা নিতে অতিরিক্ত ভোগান্তির আশঙ্কাও থাকে। তাই যাদের কাগজপত্র বা লাইসেন্স এখনো হালনাগাদ হয়নি, তাদের শেষ দিনের অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা নিরাপদ।
সব মিলিয়ে, গাড়ি ও মোটরসাইকেলের কাগজপত্র হালনাগাদের জন্য সরকার যে বিশেষ সুযোগ দিয়েছে, তার সময়সীমা শেষ হচ্ছে ২৯ অক্টোবর। এই সময়ের মধ্যে মূল কর ও ফি দিয়ে জরিমানা ছাড়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স হালনাগাদ করা যাবে। একই সঙ্গে গাড়ি বিক্রির পর মালিকানা পরিবর্তন না করা এবং ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে ড্রাইভিং লাইসেন্সের ডিমেরিট পয়েন্ট হারানোর বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। বিআরটিএর সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো থেকে স্পষ্ট, মোটরযানের কাগজপত্র নিয়মিত রাখা এবং সড়ক আইন মেনে চলার ওপর এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
