৯ বছর পর কুয়াকাটায় ফিরছে বিচ কার্নিভাল, ২৩-২৪ অক্টোবর জমবে উৎসব

প্রকাশিত: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৩ অপরাহ্ণ
৯ বছর পর কুয়াকাটায় ফিরছে বিচ কার্নিভাল, ২৩-২৪ অক্টোবর জমবে উৎসব

৯ বছর পর কুয়াকাটায় ফিরছে বিচ কার্নিভাল ২০২৬

দীর্ঘ নয় বছর পর আবারও উৎসবের আমেজে ফিরছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন গন্তব্য কুয়াকাটায় আগামী ২৩ ও ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দুই দিনব্যাপী ‘কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল ২০২৬’। সমুদ্র, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, খাবার, খেলাধুলা ও বিনোদনের নানা আয়োজন নিয়ে এবারের কার্নিভালকে ঘিরে ইতোমধ্যে পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।

কার্নিভালকে সামনে রেখে রোববার (৪ অক্টোবর) কুয়াকাটার পর্যটন হলিডে হোমসের সম্মেলনকক্ষে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের আয়োজনে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করা, পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

এর আগে ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর আয়োজকপক্ষের বিভিন্ন ব্রিফিংয়ে কার্নিভালের বিস্তারিত কর্মসূচি প্রকাশ করা হয়। সেখানে জানানো হয়, কুয়াকাটাকে শুধু একটি সমুদ্রসৈকত হিসেবে নয়, প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্থানীয় জীবনধারা ও আতিথেয়তার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরাই এবারের আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।

মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পরিচালক মো. গনী উল আজম। সভায় জেলা পরিষদের প্রশাসক স্নেহাংশু সরকার কুট্টি, বরিশাল বিভাগীয় ডিআইজি ট্যুরিস্ট পুলিশ অর্নিবান চাকমা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদেক, কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান, ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সেক্রেটারি জেনারেল আসাদুজ্জামান মিরাজসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, হোটেল-মোটেল মালিক, উদ্যোক্তা ও স্থানীয় অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় কুয়াকাটার পর্যটন খাতের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ তৈরি, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, আবাসন সুবিধা, বিনোদনের পরিসর বাড়ানো, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পর্যটন কর্মকাণ্ডে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেন, কুয়াকাটাকে শুধু একটি সমুদ্রসৈকত হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাবে না। প্রকৃতি, পর্যটন, সংস্কৃতি ও স্থানীয় অর্থনীতিকে সমন্বয় করে কুয়াকাটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন, বিনোদন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

আয়োজকদের প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ২৩ অক্টোবর সকালে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিচ ফুটবলের মধ্য দিয়ে কার্নিভালের কার্যক্রম শুরু হবে। পরে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দিনেই পর্যটকদের জন্য থাকছে সি-ফুড ও আদিবাসী ফুড ফেস্টিভ্যাল, বিচ ফুটবলের ফাইনাল, লেম্বুর বন ভ্রমণ, ঘুড়ি উৎসব, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং সূর্যাস্ত উপভোগের আয়োজন। সন্ধ্যায় থাকবে পুঁথি পাঠ, রাখাইন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, দেশীয় ফ্যাশন শো এবং মিউজিক কনসার্ট।

কার্নিভালের দ্বিতীয় দিন ২৪ অক্টোবর সকালে অনুষ্ঠিত হবে বিচ ম্যারাথন। একই দিনে গঙ্গামতির চরে সূর্যোদয় দর্শন ও পিঠা উৎসব, চর বিজয়ের উদ্দেশ্যে আনন্দভ্রমণ এবং সেলিব্রিটি বিচ ক্রিকেটের আয়োজন রাখা হয়েছে। দিনব্যাপী বাউল গানের আসর, দেশীয় ফ্যাশন শো, স্থানীয় স্কুলের শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, কমেডি শো ও সংগীতানুষ্ঠানও থাকবে। সম্মাননা ও পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে দুই দিনের এই আয়োজন শেষ হবে।

কুয়াকাটার এবারের কার্নিভালের বিশেষত্ব হলো, এটিকে শুধু বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছে না আয়োজকরা। পর্যটন করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই আয়োজনের মাধ্যমে কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, খাবার, পণ্য, খেলাধুলা ও জীবনধারাকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, কুয়াকাটার অর্থনীতির সঙ্গে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ট্যুর অপারেটর, স্থানীয় দোকান, গাইড, হস্তশিল্পী ও খাবারের উদ্যোক্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। বড় ধরনের পর্যটন আয়োজন হলে এসব খাতে অতিরিক্ত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে কার্নিভালে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়লে স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কুয়াকাটার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ হলো একই উপকূল থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ। এর সঙ্গে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, উপকূলীয় প্রকৃতি, রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য এবং স্থানীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্য যুক্ত হয়েছে। আয়োজকদের পরিকল্পনায় এসব বৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখেই কুয়াকাটাকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরও পরিচিত করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দীর্ঘ নয় বছর পর বিচ কার্নিভাল ফিরে আসায় স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যেও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাদের আশা, কার্নিভাল শুধু দুই দিনের উৎসবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর মাধ্যমে কুয়াকাটার পর্যটন ব্র্যান্ডিং আরও শক্তিশালী হবে এবং পর্যটন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আরও বেশি মানুষ এখানে ভ্রমণে আগ্রহী হবেন।

তবে বড় পর্যটন আয়োজন সফল করতে শুধু বিনোদনমূলক কর্মসূচিই যথেষ্ট নয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা, সৈকতের পরিচ্ছন্নতা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত আবাসন, চিকিৎসা ও জরুরি সেবা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কার্নিভালকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক পর্যটক সমাগম হলে এসব বিষয়ে আগে থেকেই সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন। এ বিষয়গুলো নিয়েই ৪ অক্টোবরের মতবিনিময় সভায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত ও প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে কার্নিভাল আয়োজন করা গেলে এটি কুয়াকাটার পর্যটন খাতে নতুন গতি আনবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে, নয় বছর পর কুয়াকাটায় ফিরতে যাচ্ছে বিচ কার্নিভাল। আগামী ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের দুই দিনের আয়োজন ঘিরে সমুদ্রসৈকতে যেমন উৎসবের আবহ তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি পর্যটনসংশ্লিষ্টদের আশা—এই আয়োজন কুয়াকাটাকে শুধু ছুটির দিনের ভ্রমণস্থল নয়, বরং সারা বছর পর্যটক আকর্ষণ করতে সক্ষম একটি পরিকল্পিত ও বহুমাত্রিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে নতুন একটি অধ্যায় তৈরি করবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page