কওমি মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি

প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৩৮ পূর্বাহ্ণ
কওমি মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি

কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধে নতুন নির্দেশনা

কওমি মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দেশের ছয়টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের অধিভুক্ত সব মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশে জারি করা এক নির্দেশনায় এসব কথা বলা হয়। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন এবং কিছু ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ ও অভিযোগ প্রকাশের প্রেক্ষাপটে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীকে সংশোধন করা এবং তার কল্যাণ নিশ্চিত করাই শাসনের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে। কোনোভাবেই শাসন প্রতিশোধমূলক হতে পারবে না। শিক্ষার্থীকে রাগের অবস্থায় শাস্তি না দেওয়ার পাশাপাশি ধাপে ধাপে শাসনের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে প্রথমে নম্রভাবে সতর্ক করা, প্রয়োজনে মৃদু ভর্ৎসনা এবং এরপর রাগ-ধমকের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। একান্ত প্রয়োজন হলে সর্বশেষ ধাপে অভিভাবককে ডেকে লিখিতভাবে অবহিত করে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীকে শাস্তি হিসেবে প্রহার করা যাবে না বলে নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে। লাঠি, বেত বা অন্য কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মুখমণ্ডল, মাথা বা স্পর্শকাতর কোনো অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা শরীরে দাগ সৃষ্টি হয়—এমন যেকোনো ধরনের শাস্তিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শুধু শারীরিক শাস্তিই নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে নির্যাতনমূলক আচরণ থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, তিরস্কার, কটু ভাষা ব্যবহার কিংবা ঘৃণাসূচক কোনো নামে শিক্ষার্থীকে সম্বোধন করা যাবে না। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়ত ও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।

আল-হাইআতুল উলয়ার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় না দেওয়াই তাদের নীতি। তবে বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে পুরো কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমাজ বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং ব্যক্তির অপরাধের দায় সামগ্রিকভাবে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয় বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিটি মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদাচরণ, নির্যাতন কিংবা হয়রানির অভিযোগ যাতে ওই কমিটির কাছে জানানো যায়, সে সুযোগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

অভিযোগ পাওয়ার পর সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার কথাও বলা হয়েছে।

কোনো মাদ্রাসায় সুরক্ষা কমিটি না থাকা, কমিটি নিষ্ক্রিয় থাকা অথবা অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার ইলহাক স্থগিত বা বাতিলের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে নির্দেশনায় সতর্ক করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ইসলাহী মজলিস আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিস এবং অভিভাবক সমাবেশ আয়োজন বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। অভিভাবকদের সঙ্গে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মাদ্রাসাগুলোর কার্যক্রম তদারকিতে প্রতিটি কওমি মাদ্রাসা বোর্ডকে পৃথক মনিটরিং সেল গঠন এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক হটলাইন চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর বোর্ড, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও সুরক্ষা কমিটিকে সমন্বিতভাবে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের সময় প্রার্থীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মিথ্যা অপবাদ, ভিত্তিহীন সংবাদ বা মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার নিরপরাধ শিক্ষক, শিক্ষিকা, মুহতামিম বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বোর্ডগুলোর আইনজীবী প্যানেলের মাধ্যমে আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রয়োজনে আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় হটলাইন নম্বর ০১৭০০-৭৬৩১৭৮-এ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করা যাবে বলে নির্দেশনায় জানানো হয়েছে।

চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের স্বাক্ষর করা নির্দেশনায় দেশের ছয়টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ড ও তাদের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, গত ১২ সেপ্টেম্বর আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির ৬৯তম সভা এবং এর আগে ২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট সাবকমিটির সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এ নির্দেশনা প্রণয়ন করা হয়েছে। নির্দেশনাটি তৈরির ক্ষেত্রে উলামায়ে দেওবন্দের তা‘লিম-তারবিয়তসংক্রান্ত বিভিন্ন রচনা এবং প্রসিদ্ধ দীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফতোয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page