ঘুম ভাঙতেই চারদিকে পানি, ভোরের বৃষ্টিতে তলিয়ে দীঘিনালা
দীঘিনালায় ভোরের ৩ ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে গেল নিম্নাঞ্চল, ঘুম থেকে উঠে হতবাক স্থানীয়রা
খাগড়াছড়ির দীঘিনালাসহ জেলার কয়েকটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল ভোররাতের টানা ভারী বর্ষণে আকস্মিকভাবে প্লাবিত হয়েছে। শনিবার (২২ আগস্ট) ভোররাতে প্রায় তিন ঘণ্টার লাগাতার বৃষ্টিতে মুহূর্তের মধ্যেই বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে চারপাশে পানি দেখে অনেকটা হতবাক হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোররাত থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টির কারণে দীঘিনালা উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে ডুবে যায়। একই সঙ্গে খাগড়াছড়ি শহরের উত্তর গঞ্জপাড়া, বাস টার্মিনাল এলাকা, বাঙালকাটি, শান্তিনগর, মেহেদীবাগসহ কয়েকটি এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে। এতে শত শত মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। অনেকের বাড়ির উঠান, সড়ক ও আশপাশের এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা ব।লছেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকার মানুষকে কয়েক দফা জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ভারী বৃষ্টির সময় নিচু এলাকাগুলোতে পানি জমে থাকায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সাধারণত এসব এলাকায় বড় ধরনের পানি উঠতে টানা কয়েক দিন ভারী বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হলেও এবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ব্যাপকভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে
বাসিন্দাদের ভাষ্য, মাত্র তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে এত দ্রুত পানি বাড়ার ঘটনা তাদের অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির আশপাশে পানি দেখে অনেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। পানি বাড়তে থাকায় নিচু এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্কও দেখা দেয়।
আকস্মিক এই প্লাবনের পেছনে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে পাহাড়ি অঞ্চলের ছোট নদী, ছড়া ও খালগুলোর পানি দ্রুত বেড়ে যায়। এর সঙ্গে উজান থেকে পানি নেমে এলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। স্থানীয়দের কেউ কেউ ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানির বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন।
পানি বাড়ার কারণে বিভিন্ন সড়ক ও সংযোগপথে চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তায় পানি উঠে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক ভারী বৃষ্টির কারণে শুধু জলাবদ্ধতাই নয়, পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। টানা বৃষ্টির ফলে মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় যেকোনো সময় পাহাড়ধসের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে স্থানীয়রা সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা এলেই একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা, বিভিন্ন খাল-ছড়া ও নালা ভরাট হয়ে যাওয়া এবং পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে অল্প বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে সাময়িকভাবে পানি সরে গেলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না
তাদের দাবি, শুধু জরুরি সময়ে পানি সরানোর উদ্যোগ নিলে হবে না; বরং বর্ষার আগেই পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নত করা, খাল-ছড়া পরিষ্কার ও দখলমুক্ত রাখা এবং পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিবছর বর্ষাকালে এ ধরনের দুর্ভোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্নাঞ্চলের মানুষ। অনেক পরিবারকে ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়। পানি বাড়লে রান্নাবান্না, খাবার পানি, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং কর্মজীবী মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্মও ব্যাহত হয়।
তাই আকস্মিক বৃষ্টিতে যাতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি বড় এলাকা পানির নিচে চলে না যায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ চান স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, প্রতিবছর বর্ষায় একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি না করে পানি নিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শনিবার ভোরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে দীঘিনালা ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলের এই পরিস্থিতি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—পাহাড়ি জনপদে ভারী বৃষ্টি এখন শুধু সাময়িক দুর্ভোগের বিষয় নয়, বরং পানি নিষ্কাশন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিরও প্রয়োজন রয়েছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
