ফুটপাতের ১০ টাকার শরবতে লাখ টাকার রোগ

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
ফুটপাতের ১০ টাকার শরবতে লাখ টাকার রোগ

গরমে জনপ্রিয় শরবতে থাকতে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকি

গরমে তৃষ্ণা মেটাতে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের ফুটপাত ও ব্যস্ত সড়কের পাশে বিক্রি হচ্ছে লেবু, তোকমা ও ফলের শরবত। মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকায় পাওয়া এসব পানীয় নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হলেও এর নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।

শরবত তৈরিতে ব্যবহৃত পানি, বরফ, গ্লাস ও অন্যান্য উপকরণের মান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই খাবার উপযোগী বরফের পরিবর্তে মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনে ব্যবহৃত সাধারণ বরফ শরবতে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শরবতের জন্য আলাদাভাবে নিরাপদ বরফ উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ফুটপাতের অনেক শরবতের দোকানে বড় পাত্রে শরবত তৈরি করে রাখা হচ্ছে। লেবু, চিনি, তোকমা, ফল ও বরফ অনেক সময় খোলা অবস্থায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ব্যস্ত সড়কের ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া ও দূষিত পরিবেশের মধ্যেই এসব উপকরণ রাখা হয়।

কিছু দোকানে শরবত তৈরির পানি রাখা হচ্ছে প্লাস্টিকের ড্রাম বা বালতিতে। একই পানিতে একাধিক গ্লাস ধোয়ার ঘটনাও দেখা যায়, যা পানীয়ের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

কম দামের শরবতের পেছনে বড় ঝুঁকি

ফুটপাতের শরবত সাধারণত ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়। একটি শরবতের গড় দাম ১৫ টাকা ধরলে, দিনে ৫০ গ্লাস বিক্রি করে একজন বিক্রেতার আয় হতে পারে প্রায় ৭৫০ টাকা। ১০০ গ্লাস বিক্রি হলে বিক্রি দাঁড়ায় ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ২০০ গ্লাস বিক্রি হলে ৩ হাজার টাকা।

এই পানীয়ের বড় অংশের ক্রেতা শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষ। সাশ্রয়ী হওয়ায় অনেকেই গরমে স্বস্তির জন্য এসব শরবতের ওপর নির্ভর করেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য দামের এই পানীয় থেকে যদি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে চিকিৎসা খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।

বরফ নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ

শরবতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে বরফের ব্যবহার নিয়ে। বাজারের অনেক বরফ কল মূলত মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য বরফ উৎপাদন করে। পানীয় তৈরির জন্য আলাদা নিরাপদ বরফ উৎপাদনের ব্যবস্থা খুব সীমিত।

বরফ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে বাজারে উৎপাদিত সাধারণ বরফই শরবত বিক্রেতারা কিনে নিয়ে যান। ফলে ওই বরফ পানীয়ের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

দূষিত বরফ বা পানি শরবতের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

উপকরণেও থাকতে পারে অনিয়ম

শুধু পানি ও বরফ নয়, শরবতের অন্যান্য উপকরণ নিয়েও সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। খোলা অবস্থায় রাখা লেবু, ফল, তোকমা ও চিনি ধুলাবালি ও জীবাণুর সংস্পর্শে আসতে পারে।

এ ছাড়া শরবতকে আকর্ষণীয় করতে কোথাও কোথাও অননুমোদিত রঙ বা নিম্নমানের উপাদান ব্যবহারের ঝুঁকিও থাকে। ফলে শরবতের পুরো প্রস্তুত প্রক্রিয়া নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

শরবত থেকে হতে পারে যেসব রোগ

দূষিত পানি, অনিরাপদ বরফ ও অপরিষ্কার গ্লাসে তৈরি শরবত পান করলে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ ও ই), কলেরা এবং পেটের সংক্রমণ অন্যতম। এসব রোগের প্রধান কারণ হলো জীবাণুযুক্ত পানি, অপরিষ্কার পরিবেশে তৈরি খাবার ও দূষিত উপকরণ।

আক্রান্ত হলে পেট ব্যথা, বমি, জ্বর, পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব সংক্রমণ গুরুতর আকার নিতে পারে। তাই রাস্তার পাশের শরবত বা যেকোনো পানীয় গ্রহণের আগে পানি, বরফ ও তৈরির পরিবেশের পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।

সচেতনতার বিকল্প নেই

রাস্তার পাশের ১০ বা ২০ টাকার শরবত অনেকের জন্য গরমে সাময়িক স্বস্তি এনে দেয়। কিন্তু পানীয়টি যদি দূষিত পানি, অনিরাপদ বরফ বা অপরিষ্কার গ্লাসে তৈরি হয়, তাহলে তা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।

বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। তাই ভোক্তাদের যেমন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, তেমনি নিরাপদ খাবার ও পানীয় নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারিও জরুরি।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page