ঢাকার যানজট কমাতে এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পাশাপাশি ‘মনোরেল’ ভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক চালুর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। বাজেট ঘোষণার পর থেকেই অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে-মনোরেল আসলে কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় এর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?
আরও পড়ুন-ঢাকার রাস্তায় নামছে ৬৯০ নতুন এসি বাস কোন রুটে চলবে জেনে নিন
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্য উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে ছয়টি এমআরটি লাইনের সমন্বয়ে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মেট্রোরেলের টার্মিনাল স্টেশনগুলো থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রীদের দ্রুত পৌঁছে দিতে মনোরেলভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
মনোরেল হলো এমন একটি আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা, যেখানে ট্রেন সাধারণ রেললাইনের মতো দুটি লাইনের ওপর চলে না। বরং একটি মাত্র কংক্রিট বা স্টিলের বিমের ওপর বিশেষভাবে তৈরি ট্রেন চলাচল করে। এ কারণেই এর নাম ‘মনো’ বা একক রেল ব্যবস্থা। সাধারণত মনোরেল উঁচু পিলারের ওপর নির্মিত হয় এবং এটি শহরের ব্যস্ত সড়কের ওপর দিয়েই চলাচল করতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে নগর পরিবহনে মনোরেল ব্যবহারের নজির রয়েছে। জাপান, চীন, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ব্রাজিলের বিভিন্ন শহরে মনোরেল সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে কম জায়গা ব্যবহার করে দ্রুত গণপরিবহন সেবা দেওয়ার জন্য এই প্রযুক্তি জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, মেট্রোরেল এবং মনোরেল একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক। মেট্রোরেল সাধারণত দীর্ঘ দূরত্বে বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করে। অন্যদিকে মনোরেল মেট্রোরেল স্টেশন থেকে বিভিন্ন আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যাত্রীদের পৌঁছে দিতে ফিডার নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে যাত্রীরা শেষ গন্তব্যে পৌঁছাতে কম সময় ব্যয় করবেন।
ঢাকার প্রেক্ষাপটে মনোরেলের অন্যতম বড় সুবিধা হলো কম জায়গা প্রয়োজন হওয়া। রাজধানীর অধিকাংশ সড়কই সংকীর্ণ এবং নতুন করে বড় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। মনোরেলের পিলার তুলনামূলক কম জায়গা দখল করে এবং এটি বিদ্যমান সড়কের ওপর দিয়েই নির্মাণ করা সম্ভব। ফলে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনও তুলনামূলক কম হয়।
এছাড়া মনোরেল সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক শক্তিতে পরিচালিত হওয়ায় এটি পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমে এবং বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব নগর পরিবহন ব্যবস্থার যে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, মনোরেল সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও মনোরেলকে আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়। এটি নির্দিষ্ট ট্র্যাকে চলাচল করে এবং অন্য যানবাহনের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি থাকে না। ফলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও তুলনামূলক কম।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ঢাকায় যদি মেট্রোরেল, মনোরেল এবং বৈদ্যুতিক বাস একসঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা যায়, তাহলে গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমবে, যানজট হ্রাস পাবে এবং যাতায়াতের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তবে মনোরেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক পরিকল্পনা এবং সমন্বয় প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রস্তাবিত বাজেটে শুধু মনোরেল নয়, এমআরটি লাইন-১, এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর রুট), এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ রুট), এমআরটি লাইন-২ এবং এমআরটি লাইন-৪-এর কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো বাসগুলোকে ধীরে ধীরে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাসে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী দশকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় একটি নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। বিশেষ করে মেট্রোরেলের সঙ্গে মনোরেল নেটওয়ার্ক যুক্ত হলে রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত আরও দ্রুত, নিরাপদ এবং আধুনিক হবে।
সূত্র:জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭
আরও পড়ুন-থাইল্যান্ডের সঙ্গে বৈঠকে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে এলো নতুন বার্তা










