স্মার্টফোন এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম কাজ থেকে শুরু করে দিনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনেকেই বারবার ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখছেন। প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারের এই প্রবণতা এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুনঃ- মোবাইল রিচার্জে বড় স্বস্তি, কমতে পারে সারচার্জ ও সিম কর
গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষ দিনে গড়ে কয়েক ডজন থেকে শতাধিকবার পর্যন্ত মোবাইল ফোন চেক করেন। শুধু মেসেজ বা কল নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নোটিফিকেশন কিংবা নতুন কোনো আপডেট এসেছে কি না—এসব দেখতে গিয়েই মানুষ অজান্তে বারবার ফোন হাতে নিচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Tech21–এর এক জরিপ অনুযায়ী, গড়পড়তা একজন ব্যবহারকারী দিনে প্রায় ৮০ বার মোবাইল ফোন চেক করেন। অন্যদিকে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভিউড–এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০ বার পর্যন্তও পৌঁছায়।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা আরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন গবেষণায়। কারণ পড়াশোনা, বিনোদন, যোগাযোগ, ভিডিও দেখা, গেমিং এবং সামাজিক যোগাযোগ—সবকিছুই এখন স্মার্টফোনকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ সবসময় প্রয়োজনের কারণে ফোন চেক করেন না। অনেক ক্ষেত্রে এটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নতুন কোনো নোটিফিকেশন এসেছে কি না, কেউ মেসেজ দিয়েছে কি না অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পোস্ট এসেছে কি না—এই কৌতূহল মানুষকে বারবার ফোন দেখতে বাধ্য করে।
মনোবিজ্ঞানীরা এই আচরণকে “কমপালসিভ চেকিং” বা বাধ্যতামূলক ফোন চেক করার প্রবণতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপের নোটিফিকেশন মানুষের মস্তিষ্কে স্বল্পমেয়াদি আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। একে বলা হয় “ডোপামিন রেসপন্স”। এই অনুভূতির কারণেই মানুষ অজান্তে বারবার ফোন দেখতে থাকে।
এছাড়া “ফোমো” বা “ফিয়ার অব মিসিং আউট”—অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিস হয়ে যাওয়ার ভয়ও মানুষের ফোন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, কিছুক্ষণ ফোন না দেখলে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বার্তা বা আলোচনার বাইরে চলে যাবেন। ফলে তারা ঘন ঘন ফোন আনলক করেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অনেক মানুষ এমনকি কোনো নোটিফিকেশন না এলেও অভ্যাসবশত ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিন চেক করেন। দীর্ঘদিন ধরে একই আচরণ চলতে থাকলে এটি স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে। এতে কাজের ব্যাঘাত ঘটে, পড়াশোনায় মনোসংযোগ কমে যায় এবং মানসিক চাপ বাড়তে পারে। পাশাপাশি ঘুমের সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন গবেষণায় অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের সঙ্গে মানসিক চাপ ও উদ্বেগের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার করলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হতে পারে।
তবে প্রযুক্তিবিদদের মতে, স্মার্টফোন নিজে কোনো সমস্যা নয়; মূল বিষয় হলো এর ব্যবহার পদ্ধতি। প্রয়োজন ছাড়া ঘন ঘন ফোন চেক করার অভ্যাস কমানো গেলে ডিজিটাল জীবন আরও স্বাস্থ্যকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা এজন্য নোটিফিকেশন সীমিত রাখা, নির্দিষ্ট সময় ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার না করা এবং ঘুমানোর আগে ফোন দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারেন না, দিনের বড় একটি সময় কেবল স্ক্রিনের দিকেই তাকিয়ে কেটে যাচ্ছে।
সূত্রঃ- Tech21, Reviewed ও বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা প্রতিবেদন।
আরও পড়ুনঃ- মোবাইল ডাটা নাকি WiFi-কোন ইন্টারনেট আসলে বেশি দ্রুত ও স্থিতিশীল









