১২ কেজি এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়লো কত টাকা?
১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ২৫২ টাকা
ভোক্তাদের জন্য আবারও বাড়ল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর আগে এই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। ফলে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারে ভোক্তাকে আগের তুলনায় ২৫২ টাকা বেশি গুনতে হবে।
নতুন এই মূল্য সমন্বয়ের ফলে রান্নার কাজে বহুল ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডারের খরচ সরাসরি বাড়বে। বিশেষ করে যেসব পরিবার পাইপলাইনের গ্যাসের পরিবর্তে সিলিন্ডার ব্যবহার করে রান্নার কাজ চালায়, তাদের মাসিক গৃহস্থালি ব্যয়ে এর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বিইআরসি ১২ কেজি বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ওই মূল্য কার্যকর হয়। তখন আগস্টের নির্ধারিত ১ হাজার ৫৯৮ টাকা থেকে ১৩ টাকা কমানো হয়েছিল। কমিশনের নির্ধারিত সেই দাম পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা ছিল।
এবার ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলে সেপ্টেম্বরের দামের তুলনায় প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারে মূল্য বাড়ছে ২৫২ টাকা। শতকরা হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ কোনো পরিবার মাসে একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ব্যবহার করলে শুধু সিলিন্ডারের মূল্য বৃদ্ধির কারণেই মাসিক খরচ ২৫২ টাকা বাড়বে। যারা মাসে একাধিক সিলিন্ডার ব্যবহার করেন, তাদের অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণও সেই অনুপাতে বাড়বে।
এলপিজির দাম প্রতি মাসে পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের এলপিজির মূল্য নির্ধারণে বিইআরসি সৌদি আরামকোর নির্ধারিত কন্ট্রাক্ট প্রাইস বা সৌদি সিপিকে অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। প্রোপেন ও বিউটেনের আন্তর্জাতিক মূল্য, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে কমিশন ভোক্তা পর্যায়ের দাম সমন্বয় করে।
সেপ্টেম্বরের মূল্য নির্ধারণের সময় সৌদি আরামকো প্রোপেনের কন্ট্রাক্ট মূল্য প্রতি টন ৬২৫ মার্কিন ডলার এবং বিউটেনের মূল্য ৬৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করেছিল। প্রোপেন ও বিউটেনের ৩৫:৬৫ মিশ্রণ অনুপাত বিবেচনায় তখন ভারিত গড় সৌদি সিপি দাঁড়ায় প্রতি টন ৬৪৭ দশমিক ৭৫ মার্কিন ডলার। এর ভিত্তিতে ভোক্তা পর্যায়ে বেসরকারি এলপিজির দাম প্রতি কেজি ১৩২ টাকা ১২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বিইআরসির নির্ধারিত দামের ক্ষেত্রে ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজারে এলপিজি কোম্পানি, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। কমিশন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বোতলজাত এলপিজি বিক্রি করা যাবে না—সেপ্টেম্বরের আদেশেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছিল।
তবে বাস্তব বাজারে সরকারি মূল্য ও খুচরা বিক্রয়মূল্যের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। ফলে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর শুধু বিইআরসি কত টাকা নির্ধারণ করেছে, সেটিই নয়; নির্ধারিত মূল্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নজরদারির বিষয়ও সামনে আসবে।
চলতি বছর এলপিজির দামে একাধিকবার বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। জুলাইয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৩৫৭ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫২৮ টাকা করা হয়েছিল। পরে আগস্টে তা ৭০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা করা হয়। সেপ্টেম্বরে আবার ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজার ও অন্যান্য ব্যয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির দাম একাধিকবার ওঠানামা করেছে।
এলপিজির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু রান্নার খরচে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাসাবাড়ির পাশাপাশি রেস্টুরেন্ট, খাবারের দোকান, বেকারি, ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসা এবং এলপিজিনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জ্বালানি খরচ বেড়ে গেলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামের ওপর পড়ার সম্ভাবনাও থাকে।
অন্যদিকে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বিইআরসি নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করে। সেপ্টেম্বর মাসে অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটার ৭৩ টাকা ৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা আগের দামের তুলনায় ৫৮ পয়সা কম ছিল।
এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—বেসরকারি এলপিজির দাম এবং সরকারি এলপিজির দাম এক নয়। সেপ্টেম্বরের আদেশ অনুযায়ী ১২ দশমিক ৫ কেজির সরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের ভোক্তা পর্যায়ের দাম ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। তাই বাজারে প্রচলিত ১২ কেজি বেসরকারি এলপিজির নতুন দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা এবং সরকারি ১২ দশমিক ৫ কেজি এলপিজির দামকে একই বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না।
সব মিলিয়ে নতুন মূল্য কার্যকর হলে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য ভোক্তাদের আগের চেয়ে ২৫২ টাকা বেশি খরচ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারদর ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বিইআরসির মাসভিত্তিক মূল্য সমন্বয়ের ধারাবাহিকতায় এবারও দাম বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে নতুন মূল্য বাজারে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং ভোক্তারা নির্ধারিত দামে এলপিজি পাচ্ছেন কি না, সেটিই এখন নজর রাখার বিষয়।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
