ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করে আয়, কীভাবে কিনবেন? জানুন আপডেট নিয়ম
ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগ করা যায়।
নিরাপদ বিনিয়োগের কথা ভাবলে ব্যাংকের আমানত, সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজও অনেকের আগ্রহের বিষয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের ট্রেজারি বন্ড বা Bangladesh Government Treasury Bond (BGTB) দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এটি মূলত সরকার কর্তৃক ইস্যু করা ঋণপত্র, যার মাধ্যমে সরকার অর্থ সংগ্রহ করে এবং বিনিয়োগকারী নির্ধারিত হারে কুপন বা সুদ পান। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ট্রেজারি বন্ড রয়েছে।
ট্রেজারি বন্ডকে সহজভাবে বললে, একজন বিনিয়োগকারী সরকারকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকা দেন এবং বিনিময়ে বন্ডের শর্ত অনুযায়ী নিয়মিত কুপন আয় পান। মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। BGTB-এর কুপন হার নিলামের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় এবং কুপন সাধারণত বছরে দুইবার পরিশোধ করা হয়। কুপন হার একবার নির্ধারিত হলে বন্ডের মেয়াদজুড়ে তা স্থির থাকে।
ট্রেজারি বন্ড ও ট্রেজারি বিল এক জিনিস নয়। ট্রেজারি বিল হলো এক বছরের মধ্যে মেয়াদি স্বল্পমেয়াদি সরকারি সিকিউরিটি, যার মেয়াদ ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন। অন্যদিকে ট্রেজারি বন্ডের মেয়াদ এক বছরের বেশি এবং বর্তমানে ২ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, উভয় ধরনের সরকারি সিকিউরিটিই নিলামের মাধ্যমে ইস্যু হয় এবং পরবর্তীতে সেকেন্ডারি মার্কেটেও কেনাবেচা করা যায়।
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরাও ট্রেজারি বন্ড কিনতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের বাসিন্দা ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান BGTB-তে বিনিয়োগের জন্য যোগ্য। সাধারণ বিনিয়োগকারী সরাসরি নিলামে দরপত্র জমা দেন না; নির্ধারিত Primary Dealer (PD) বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে নিলামে অংশ নিতে পারেন। এছাড়া ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অনুমোদিত ডিলারের মাধ্যমে সেকেন্ডারি মার্কেট থেকেও ট্রেজারি বন্ড কেনা যায়।
ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পরিমাণও জানা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী, নিলামে BGTB কেনার ন্যূনতম পরিমাণ ১ লাখ টাকা এবং এরপর ১ লাখ টাকার গুণিতকে বিনিয়োগ করা যায়। অর্থাৎ ১ লাখ, ২ লাখ, ৩ লাখ টাকা বা তার বেশি পরিমাণে বিনিয়োগ করা সম্ভব।
বিনিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করতে আগ্রহী ব্যক্তিকে প্রথমে এমন একটি নির্ধারিত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, যেখানে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যাংক সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের জন্য প্রয়োজনীয় Business Partner Identification (BP ID) খোলার উদ্যোগ নেয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের Market Infrastructure (MI) Module-এ সিকিউরিটিজ হিসাব পরিচালনার ব্যবস্থা করে। ব্যাংকগুলোর Government Securities Investment Window-এর মাধ্যমে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এরপর বিনিয়োগকারী চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত বার্ষিক নিলাম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নির্দিষ্ট মেয়াদের বন্ডের নিলামে অংশ নিতে পারেন। তবে নিলামে অংশ নেওয়ার জন্য Primary Dealer-এর মাধ্যমে দরপত্র দিতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নিলাম ক্যালেন্ডারেও ২, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের বিভিন্ন নিলামের সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছে।
নিলামে বিনিয়োগ না করেও সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে ট্রেজারি বন্ড কেনার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, BGTB ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেকেন্ডারি মার্কেটে কেনাবেচা করা যায়। বর্তমানে সরকারি সিকিউরিটিজের সেকেন্ডারি মার্কেটে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেনের পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও ট্রেজারি বন্ড লেনদেনের ব্যবস্থা রয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে BOID থাকা বিনিয়োগকারীরা BGTB কিনতে পারেন।
ট্রেজারি বন্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর কুপন আয়। বন্ডের কুপন সাধারণত অর্ধবার্ষিক ভিত্তিতে দেওয়া হয়। তবে বাজারে বন্ড কেনাবেচার সময় এর দাম ও বাজার-ফলন বা yield পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে কোনো বিনিয়োগকারী মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বন্ড বিক্রি করলে তিনি ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি বা কম দামে বিক্রি করতে পারেন। তাই ট্রেজারি বন্ডকে শুধু নির্ধারিত কুপন হারের বিনিয়োগ হিসেবে দেখলে হবে না; বাজারদর ও মেয়াদও বিবেচনায় নিতে হবে।
আরেকটি বিষয় হলো, ট্রেজারি বন্ডে সাধারণ অর্থে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরাসরি ‘premature encashment’ বা আগাম নগদায়নের ব্যবস্থা নেই। তবে প্রয়োজন হলে সেকেন্ডারি মার্কেটে বন্ড বিক্রি করা যায়। এ কারণে বিনিয়োগের আগে কতদিন টাকা বিনিয়োগ করে রাখা সম্ভব, তা বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয় ও লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করের নিয়মও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, BGTB থেকে পাওয়া বিনিয়োগ আয়ের ওপর বিদ্যমান কর আইন অনুযায়ী কর প্রযোজ্য হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরকারি সিকিউরিটিজ মার্কেটের তথ্য অনুযায়ী, BGTB-তে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আয়কর আইনের নির্দিষ্ট বিধানের অধীনে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের জন্য কর রেয়াতের সুবিধাও রয়েছে। বিনিয়োগের আগে বর্তমান করহার ও প্রযোজ্য শর্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা কর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাচাই করা উচিত।
সব মিলিয়ে, ট্রেজারি বন্ড হলো সরকারের ইস্যু করা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগযোগ্য সিকিউরিটি, যেখানে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরাও অংশ নিতে পারেন। বর্তমানে ২, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি BGTB রয়েছে এবং ন্যূনতম বিনিয়োগের পরিমাণ ১ লাখ টাকা। নিলামের মাধ্যমে Primary Dealer-এর সহায়তায় অথবা সেকেন্ডারি মার্কেটে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে বিনিয়োগের আগে বর্তমান কুপন হার, বাজারমূল্য, মেয়াদ, কর ও লেনদেনের খরচ যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এটি সাধারণ তথ্য; ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা অনুমোদিত বিনিয়োগ পরামর্শকের সঙ্গে পরামর্শ করা ভালো।
