সঞ্চয়পত্র কিনবেন? জেনে নিন নিয়ম ও সর্বশেষ তথ্য
সঞ্চয়পত্র কী এবং কীভাবে সঞ্চয়পত্র কেনা যায়, জেনে নিন বিস্তারিত।
বাংলাদেশে নিরাপদভাবে সঞ্চয় করার জনপ্রিয় সরকারি মাধ্যমগুলোর মধ্যে সঞ্চয়পত্র অন্যতম। সাধারণভাবে সঞ্চয়পত্র হলো সরকারের ইস্যু করা একটি সঞ্চয়ভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করলে নিয়ম অনুযায়ী মুনাফা পাওয়া যায়। ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে। এসব স্কিমের মেয়াদ, মুনাফা পাওয়ার পদ্ধতি, বিনিয়োগের সীমা ও যোগ্যতা একেকটির ক্ষেত্রে একেক রকম। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্র—এই চার ধরনের সঞ্চয়পত্র প্রচলিত রয়েছে।
২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোর মুনাফার হার জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ জানুয়ারি–জুন ২০২৬ সময়ে যে হার ও শর্ত কার্যকর ছিল, জুলাই–ডিসেম্বর সময়েও একই হার ও শর্তে তা বহাল রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ৬ জুলাই ২০২৬ তারিখের সার্কুলারে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে।
পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য অন্যতম পরিচিত সঞ্চয় স্কিম। সর্বশেষ কার্যকর হারে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং ৭ লাখ ৫০ হাজার ১ টাকা থেকে বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হার ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এ সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পাঁচ বছর এবং এটি জাতীয় সঞ্চয় অফিস, বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা, তফসিলি ব্যাংক ও ডাকঘর থেকে কেনা ও নগদায়ন করা যায়।
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ তিন বছর। সর্বশেষ কার্যকর হারে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদপূর্তির মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং এর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এই সঞ্চয়পত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি তিন মাস অন্তর মুনাফা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ স্কিমও জাতীয় সঞ্চয় অফিস, বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা, তফসিলি ব্যাংক ও ডাকঘর থেকে কেনা যায়।
পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পাঁচ বছর এবং এটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশি নারী, যেকোনো বয়সের বাংলাদেশি শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশি নারী-পুরুষ এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। একক নামে পরিবার সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা যায়। সর্বশেষ কার্যকর হারে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদপূর্তির মুনাফার হার ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং এর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এই সঞ্চয়পত্রে নিয়ম অনুযায়ী মাসিক ভিত্তিতে মুনাফা পাওয়ার সুবিধা রয়েছে।
পেনশনার সঞ্চয়পত্র মূলত নির্দিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের নির্দিষ্ট পেনশন সুবিধাভোগীদের জন্য। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং মৃত চাকরিজীবীর পারিবারিক পেনশন সুবিধাভোগী স্বামী, স্ত্রী বা সন্তান এ সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। প্রাপ্ত আনুতোষিক ও ভবিষ্য তহবিলের অর্থ মিলিয়ে একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের সীমা রয়েছে। সর্বশেষ কার্যকর হারে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মেয়াদপূর্তির মুনাফার হার ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং এর বেশি বিনিয়োগে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ।
সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নির্ধারিত আবেদন ফরম জমা দিতে হয়। সাধারণভাবে ক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদের তথ্য ও কপি প্রয়োজন হতে পারে। নমিনি থাকলে তাঁর পরিচয়পত্রের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় ছবি দিতে হয়। সঞ্চয়পত্রের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্রের প্রয়োজন হতে পারে। তাই কেনার আগে সংশ্লিষ্ট সঞ্চয় অফিস, ব্যাংক বা ডাকঘর থেকে সর্বশেষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া ভালো। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত ফরম পূরণ করে চেক বা নগদের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করে সঞ্চয়পত্র কেনার ব্যবস্থা রয়েছে।
সঞ্চয়পত্র কেনার সময় বিনিয়োগের সীমার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পরিবার সঞ্চয়পত্রে সমন্বিতভাবে একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা এবং যুগ্ম নামে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা যায়। তবে পরিবার সঞ্চয়পত্র যৌথ নামে কেনা যায় না এবং এর নিজস্ব সর্বোচ্চ সীমা ৪৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত আনুতোষিক ও ভবিষ্য তহবিলের অর্থের ভিত্তিতে একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের নিয়ম রয়েছে।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে করও প্রযোজ্য। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পরিবার সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সর্বমোট বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ এবং এর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হয়। পেনশনার সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের মুনাফায় উৎসে কর কাটা হয় না; পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলে মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর প্রযোজ্য।
সঞ্চয়পত্র মেয়াদপূর্তির আগে নগদায়ন করা সম্ভব হলেও সে ক্ষেত্রে পূর্ণ মেয়াদের নির্ধারিত মুনাফা সবসময় পাওয়া যায় না। কোন সময় নগদায়ন করা হচ্ছে তার ওপর নির্ধারিত হারে মুনাফা হিসাব করা হয় এবং আগে বেশি মুনাফা দেওয়া হয়ে থাকলে অতিরিক্ত অংশ মূল টাকা থেকে সমন্বয় করা হতে পারে। তাই সঞ্চয়পত্র কেনার আগে কতদিন টাকা বিনিয়োগ করে রাখার সক্ষমতা রয়েছে এবং মেয়াদপূর্বে টাকা প্রয়োজন হতে পারে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, সঞ্চয়পত্র দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের একটি সরকারি মাধ্যম হলেও এর প্রতিটি স্কিমের নিয়ম, যোগ্যতা, বিনিয়োগসীমা ও মুনাফার হার আলাদা। ২০২৬ সালের জুলাই–ডিসেম্বর সময়ের জন্য বিদ্যমান মুনাফার হার ও শর্ত অপরিবর্তিত রয়েছে। তাই সঞ্চয়পত্র কেনার আগে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী স্কিম নির্বাচন, বর্তমান মুনাফার হার, উৎসে কর, বিনিয়োগসীমা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে নেওয়া উচিত। সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা পরিবর্তিত হতে পারে, তাই বিনিয়োগের সময় জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট সঞ্চয় অফিসের হালনাগাদ তথ্য অনুসরণ করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
