নরমাল ডেলিভারি রুম না থাকলে থাকবে না হাসপাতালের লাইসেন্স

স্বাস্থ্য প্রতিনিধি
প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ২:৩৩ অপরাহ্ণ
নরমাল ডেলিভারি রুম না থাকলে থাকবে না হাসপাতালের লাইসেন্স

সব বেসরকারি হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি রুম বাধ্যতামূলক

দেশের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে স্বাভাবিক প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) সুযোগ নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। এখন থেকে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নরমাল ডেলিভারি বা লেবার রুম না থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বহাল থাকবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লেবার রুম স্থাপনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীতে বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানে মাতৃস্বাস্থ্য, নিরাপদ প্রসব, দক্ষ মিডওয়াইফের ভূমিকা এবং দেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের হার বৃদ্ধির বিষয়েও বিস্তারিত কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তিনি জানান, আগামী শনিবারের মধ্যেই দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নরমাল ডেলিভারির জন্য প্রয়োজনীয় লেবার রুম চালু করতে হবে। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো ধরনের গাফিলতি বা অবহেলা গ্রহণ করা হবে না। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও যেসব হাসপাতাল বা ক্লিনিকে লেবার রুম থাকবে না, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু বর্তমানে দেশের একটি অংশ স্বাস্থ্যসেবাকে শুধুমাত্র ব্যবসা হিসেবে দেখছে। মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিবর্তে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এই প্রবণতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন।

তিনি বলেন, একসময় বাংলাদেশে অধিকাংশ সন্তান জন্ম হতো স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অভিজ্ঞ দাইয়ের সহায়তায় নিরাপদভাবে সন্তান প্রসবের দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। সময়ের সঙ্গে চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত প্রয়োজন না থাকলেও সিজারিয়ান অপারেশনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।

মন্ত্রী অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীর নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কিছু অসাধু দালালচক্র এবং নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিবারের সদস্যদের অযথা ভয়ভীতি দেখায়। ‘অপারেশন না করলে মা কিংবা সন্তান বাঁচবে না’—এ ধরনের আশঙ্কা তৈরি করে অনেক পরিবারকে সিজারিয়ান করাতে বাধ্য করা হয়। মা ও নবজাতকের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে নিলেও সব ক্ষেত্রে সেই অপারেশন চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজনীয় ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের আস্থা অত্যন্ত গভীর। একজন রোগী চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি বিশ্বাস করেন, তার সর্বোত্তম চিকিৎসাই নিশ্চিত করা হবে। তাই চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতা, পেশাগত দায়িত্ববোধ এবং রোগীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্যসেবা কখনোই অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হতে পারে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান কমাতে হলে দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। শুধু লেবার রুম স্থাপন করলেই হবে না, সেখানে প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ, দক্ষ নার্স এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও থাকতে হবে। নিরাপদ নরমাল ডেলিভারির পরিবেশ তৈরি করা গেলে মায়েদের ঝুঁকি যেমন কমবে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

তিনি মাতৃস্বাস্থ্য এবং নবজাতকের পুষ্টির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন। তার ভাষায়, একটি সুস্থ শিশুর জন্ম নিশ্চিত করতে হলে গর্ভধারণের শুরু থেকেই মায়ের সঠিক পুষ্টি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের অনেক এলাকায় এখনো অপুষ্টি, অল্প বয়সে বিয়ে এবং মায়েদের দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে নবজাতক নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।

মন্ত্রী বলেন, অনেক শিশুই জন্মের পর অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক মায়ের শরীরেও পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব রয়েছে। এর ফলে নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতকের পুষ্টি এবং নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার ওপর জোর দেন তিনি।

স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকার ঘোষিত এই সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে স্বাভাবিক প্রসবের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এতে একদিকে যেমন অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান কমবে, অন্যদিকে প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক ক্ষেত্রে কমে আসবে। পাশাপাশি নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রসূতি সেবা দেওয়া হলেও সব প্রতিষ্ঠানে নরমাল ডেলিভারির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। সরকারের নতুন নির্দেশনার ফলে এখন এসব প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে লেবার রুম স্থাপন করতে হবে। অন্যথায় লাইসেন্স হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হবে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তকে মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নির্দেশনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়বে এবং স্বাস্থ্য খাতে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের প্রবণতাও ধীরে ধীরে কমে আসবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন