প্রোটিন মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। শরীরের পেশি গঠন, কোষের মেরামত, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন হরমোন তৈরিতে প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ থেকে শুরু করে জিমে ব্যায়াম করা তরুণ-তরুণী—সবার কাছেই প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের গুরুত্ব অনেক বেশি।
প্রোটিনের উৎসের কথা উঠলে সাধারণত দুটি খাবারের নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়—দুধ এবং ডিম। দুটিই সহজলভ্য, তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুধ ও ডিমের মধ্যে কোনটিতে বেশি প্রোটিন থাকে? আর পেশি গঠন বা সুস্বাস্থ্যের জন্য কোনটি বেশি উপকারী?
আরও পড়ুন-ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কী? উপকারিতা, ঝুঁকি ও কত দিন করা নিরাপদ
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে শুধু প্রোটিনের পরিমাণ নয়, প্রোটিনের মান, হজম ক্ষমতা এবং অন্যান্য পুষ্টিগুণও বিবেচনায় নিতে হবে।
দুধ ও ডিমে কতটা প্রোটিন থাকে?
পুষ্টিবিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, একটি বড় মাপের ডিমে সাধারণত ৬ থেকে ৭ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়। অন্যদিকে ২৫০ মিলিলিটার বা এক গ্লাস দুধে প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন থাকে।
সংখ্যার হিসাবে দেখলে দুধে সামান্য বেশি প্রোটিন পাওয়া যায়। তবে এই পার্থক্য এতটাই কম যে শুধুমাত্র প্রোটিনের পরিমাণ দেখে একটিকে অন্যটির চেয়ে অনেক ভালো বলা যায় না। বরং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটিই উচ্চমানের বা “কমপ্লিট প্রোটিন”। অর্থাৎ মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় সব অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড এই দুটি খাবারেই রয়েছে।
কমপ্লিট প্রোটিন বলতে কী বোঝায়?
আমাদের শরীর নিজে সব ধরনের অ্যামাইনো অ্যাসিড তৈরি করতে পারে না। কিছু অ্যামাইনো অ্যাসিড খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। যেসব খাবারে শরীরের প্রয়োজনীয় সব অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে, সেগুলোকে কমপ্লিট প্রোটিন বলা হয়। ডিম এবং দুধ উভয়ই এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই পুষ্টিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে এই দুটি খাবারকে আদর্শ প্রোটিন উৎস হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন।
ডিম কেন এত জনপ্রিয়?
ডিমকে অনেক সময় “প্রকৃতির মাল্টিভিটামিন” বলা হয়। কারণ এতে শুধু প্রোটিনই নয়, আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
ডিমে পাওয়া যায়—
- উচ্চমানের প্রোটিন।
- ভিটামিন বি১২।
- কোলিন।
- সেলেনিয়াম।
- ভিটামিন ডি।
- স্বাস্থ্যকর চর্বি।
বিশেষ করে কোলিন মস্তিষ্কের বিকাশ এবং স্মৃতিশক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডিমের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি সহজে হজম হয়। শরীর খুব দ্রুত এর প্রোটিন ব্যবহার করতে পারে। এ কারণে জিমে ব্যায়াম করেন এমন অনেকের খাদ্যতালিকায় ডিম নিয়মিত থাকে।
দুধ কেন আলাদা?
দুধের প্রোটিনের বিশেষত্ব হলো এতে দুই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন থাকে—
- Whey Protein.
- Casein Protein.
এই দুই ধরনের প্রোটিন শরীরে ভিন্নভাবে কাজ করে।
Whey Protein
হোয়ে প্রোটিন খুব দ্রুত হজম ও শোষিত হয়। ব্যায়ামের পর পেশি পুনর্গঠনে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ কারণেই বাজারে পাওয়া অধিকাংশ প্রোটিন সাপ্লিমেন্টের মূল উপাদান হিসেবে হোয়ে ব্যবহার করা হয়।
Casein Protein
কেসিন তুলনামূলক ধীরে হজম হয়। ফলে এটি দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে অ্যামাইনো অ্যাসিড সরবরাহ করতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমানোর আগে দুধ পান করলে শরীর কয়েক ঘণ্টা ধরে ধীরে ধীরে প্রোটিন পেতে থাকে, যা পেশি সংরক্ষণে সহায়ক হতে পারে।
পেশি গঠনে কোনটি বেশি কার্যকর?
এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো একক উত্তর নেই। যদি দ্রুত প্রোটিন সরবরাহের কথা বলা হয়, তাহলে ডিম এবং হোয়ে-সমৃদ্ধ দুধ দুটিই কার্যকর। তবে অনেক ফিটনেস বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ব্যায়ামের পর ডিম ও দুধ একসঙ্গে গ্রহণ করলে শরীর আরও ভালোভাবে উপকৃত হতে পারে। কারণ ডিম দ্রুত অ্যামাইনো অ্যাসিড সরবরাহ করে এবং দুধের কেসিন দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে প্রোটিন সরবরাহ অব্যাহত রাখে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সুবিধাও রয়েছে
২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় গবেষকরা দেখেছেন, দুধ ও ডিম শুধু পেশি গঠনের জন্যই উপকারী নয়।দুধের প্রোটিন হজম হওয়ার সময় কিছু জৈব পেপটাইড তৈরি হয়, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে।এসব উপাদান শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। ডিমেও এমন কিছু জৈব যৌগ রয়েছে যা শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
ওজন কমাতে চাইলে কোনটি ভালো?
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে ডিম অনেকের জন্য ভালো বিকল্প হতে পারে। কারণ ডিম খেলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূত হয়। ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে পূর্ণচর্বিযুক্ত দুধে ক্যালোরি তুলনামূলক বেশি থাকে। তবে লো-ফ্যাট বা স্কিমড মিল্ক বেছে নিলে সেই সমস্যা অনেকটাই কমে যায়।
শিশুদের জন্য কোনটি বেশি উপকারী?
শিশুদের বৃদ্ধির জন্য দুধ ও ডিম দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। দুধে থাকা ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস হাড় ও দাঁতের বিকাশে সাহায্য করে। অন্যদিকে ডিমে থাকা উচ্চমানের প্রোটিন, কোলিন এবং ভিটামিন শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ভূমিকা রাখে। তাই শিশুদের খাদ্যতালিকায় দুটিই রাখা হলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়।
প্রতিদিন কতটুকু খাওয়া উচিত?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে—
- সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন ১ থেকে ২টি ডিম খেতে পারেন।
- প্রতিদিন ১ থেকে ২ গ্লাস দুধ পান করাও উপকারী হতে পারে।
- ব্যক্তির বয়স, ওজন, স্বাস্থ্য অবস্থা এবং শারীরিক কার্যক্রম অনুযায়ী চাহিদা ভিন্ন হতে পারে।
যাদের বিশেষ কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
তাহলে কোনটি খাবেন?
দুধ ও ডিমের মধ্যে কে “বিজয়ী”—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বিষয়টি কিছুটা ভুলভাবে দেখা হয়। কারণ এই দুটি খাবার একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক। দুধে সামান্য বেশি প্রোটিন থাকলেও ডিমের পুষ্টিগুণও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। একটি শরীরকে দ্রুত প্রোটিন দেয়, অন্যটি দীর্ঘ সময় ধরে প্রোটিন সরবরাহ করে। দুটিই গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন, খনিজ এবং স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রদান করে। তাই পুষ্টিবিদদের মতে, সম্ভব হলে খাদ্যতালিকায় দুধ ও ডিম—দুটিই রাখা সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
শেষ কথা
প্রোটিনের পরিমাণের বিচারে এক গ্লাস দুধে সাধারণত একটি বড় ডিমের তুলনায় সামান্য বেশি প্রোটিন থাকে। তবে স্বাস্থ্য উপকারিতা, প্রোটিনের মান এবং পুষ্টিগুণের দিক থেকে দুটিই অসাধারণ খাবার। শরীরের চাহিদা অনুযায়ী দুধ ও ডিম একসঙ্গে খাদ্যতালিকায় রাখলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া সম্ভব।
সূত্র: Dhaka post
আরও পড়ুন-চিকিৎসা ব্যয় কমাতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিলো সরকার










