শরিয়াহ্সম্মত ইসলামী ব্যাংকিংয়ে কিস্তিতে বাড়ি ও গাড়ি কেনার সুবিধা
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কিস্তিতে বাড়ি ও গাড়ি কেনার সুযোগ।
মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য নিজের একটি বাড়ি বা গাড়ি কেনা অনেক সময়ই আজীবনের স্বপ্ন হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবে উচ্চমূল্য, এককালীন অর্থের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সুদভিত্তিক ঋণের চাপের কারণে এই স্বপ্ন অনেকের কাছেই অধরা থেকে যায়। এমন পরিস্থিতিতে শরিয়াহ্সম্মত কাঠামোর ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক একটি বিকল্প আর্থিক সমাধান হিসেবে সামনে আসছে।
বাংলাদেশে শরিয়াহ্সম্মত অর্থায়নের মাধ্যমে বাড়ি ও গাড়ি কেনার সুযোগ দিন দিন বাড়ছে। প্রচলিত ঋণের মতো সরাসরি সুদের ভিত্তিতে অর্থ ধার দেওয়ার পরিবর্তে ইসলামী অর্থায়নে বিভিন্ন কাঠামো ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে বাড়ি কেনা বা নির্মাণের জন্য হোম ফাইন্যান্স এবং গাড়ির জন্য অটো ফাইন্যান্স উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানভেদে মুরাবাহা, ইজারা অথবা হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিলক (HPSM)-এর মতো কাঠামো ব্যবহার করা হয়। কোন পণ্য কোন কাঠামোয় দেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চুক্তির ওপর নির্ভর করে।
ইসলামী অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, অর্থায়নটি কোনো বাস্তব সম্পদ বা সম্পদভিত্তিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। উদাহরণ হিসেবে HPSM পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠান ও গ্রাহক শুরুতে কোনো গাড়ির যৌথ মালিক হতে পারেন। এরপর গ্রাহক নির্ধারিত সময় অনুযায়ী মাসিক ভাড়া বা কিস্তি পরিশোধ করতে থাকেন এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ধীরে ধীরে সম্পদের মালিকানা গ্রাহকের কাছে চলে যায়। IFIC ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অটো ফাইন্যান্সে এই HPSM কাঠামোর কথা উল্লেখ করেছে।
গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন ইসলামী অর্থায়ন পণ্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে IFIC Islamic-এর HPSM Auto Finance-এ নতুন ও পুনঃসংস্কার করা গাড়ি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অর্থায়নের কথা বলা হয়েছে। তাদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই পণ্যে ৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ এবং ১২ থেকে সর্বোচ্চ ৬০ মাস পর্যন্ত মেয়াদ রয়েছে। তবে এগুলো একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পণ্যের শর্ত; অন্য ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে অর্থায়নের পরিমাণ, মেয়াদ ও যোগ্যতা ভিন্ন হতে পারে।
গাড়ির ক্ষেত্রে আরেকটি উদাহরণ হলো DBH Islamic-এর Car Financing। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, HPSM পদ্ধতিতে নতুন, রিকন্ডিশন্ড বা ব্যবহৃত গাড়ি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অর্থায়ন করা যায়। সেখানে গাড়ির মূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ এবং ১২ থেকে সর্বোচ্চ ৭২ মাস পর্যন্ত মেয়াদের কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ একই ধরনের ইসলামী অর্থায়ন হলেও প্রতিষ্ঠানভেদে অর্থায়নের সীমা ও কিস্তির মেয়াদে পার্থক্য থাকতে পারে।
বাড়ি কেনা বা নির্মাণের ক্ষেত্রেও শরিয়াহ্সম্মত হোম ফাইন্যান্সের ব্যবস্থা রয়েছে। DBH Islamic তাদের সেবার মধ্যে Islamic Home Financing উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের ইসলামী অর্থায়ন সেবা স্বাধীন Shariah Supervisory Committee দ্বারা যাচাই করা হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়। তাই বাড়ির অর্থায়ন নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চুক্তির ধরন, সম্পদের মালিকানা, মাসিক পরিশোধের কাঠামো ও অন্যান্য শর্ত ভালোভাবে বুঝে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামী অর্থায়নে মাসিক কিস্তি থাকলেও সেটিকে সাধারণ সুদভিত্তিক ঋণের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। কারণ ইসলামী ফাইন্যান্সের বিভিন্ন পণ্যে বিক্রয়, ভাড়া বা যৌথ মালিকানার কাঠামো ব্যবহার করা হয়। যেমন Standard Chartered Bangladesh-এর Saadiq Personal Finance Goods Murabaha কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। সেখানে ব্যাংক গ্রাহকের প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করে নির্ধারিত মুনাফা যোগ করে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে এবং গ্রাহক নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করেন।
তবে কোনো অর্থায়নকে শুধু ‘ইসলামী’ বা ‘শরিয়াহ্সম্মত’ নাম দেওয়া হয়েছে বলেই সব শর্ত না বুঝে চুক্তি করা উচিত নয়। গ্রাহকের উচিত চুক্তিতে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, সম্পদ কেনা বা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া, মুনাফা বা ভাড়ার হিসাব, কিস্তির সংখ্যা, বিলম্ব হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আগাম পরিশোধের নিয়ম এবং অন্যান্য ফি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া। কারণ এসব শর্ত একেক প্রতিষ্ঠানের পণ্যে একেক রকম হতে পারে।
বাড়ি বা গাড়ির মতো বড় সম্পদ কেনার আগে নিজের মাসিক আয় ও নিয়মিত খরচের সঙ্গে কিস্তির পরিমাণ সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। শুধু দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি পাওয়া যাচ্ছে বলে বেশি অর্থায়ন নেওয়া সবসময় সুবিধাজনক নাও হতে পারে। মোট কত টাকা পরিশোধ করতে হবে, প্রাথমিকভাবে কত টাকা দিতে হবে এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ কী রয়েছে—এসব হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে শরিয়াহ্সম্মত অর্থায়নের মাধ্যমে কিস্তিতে বাড়ি ও গাড়ি কেনার সুযোগ রয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ জন্য আলাদা পণ্য পরিচালনা করছে। তবে কিস্তি, অর্থায়নের সীমা, মেয়াদ ও যোগ্যতার শর্ত প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা। তাই নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সেবা নেওয়ার আগে তাদের সর্বশেষ প্রকাশিত শর্ত ও চুক্তি যাচাই করা জরুরি
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
