শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শূন্য ২,৮৪২ শিক্ষক পদ

শিক্ষা ও ক্যারিয়ার প্রতিনিধি
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শূন্য ২,৮৪২ শিক্ষক পদ

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের কারণে পাঠদান ও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও প্রকট আকার ধারণ করেছে শিক্ষক সংকট। সহকারী শিক্ষক থেকে শুরু করে প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বহু পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ১৫ হাজার ২৯৩টি পদের মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের ১৮ শতাংশেরও বেশি শিক্ষক নেই।

নিয়োগের উদ্যোগ, তবুও সংকট কাটছে না
সম্প্রতি সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে ৭২৮ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই নিয়োগ সম্পন্ন হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ খালি থেকেই যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ বলেন, শিক্ষক সংকট কমাতে সরকার কাজ করছে। দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ এবং প্রশাসনিক পদ পূরণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পিএসসির মধ্যে সমন্বয় চলছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এখনও লক্ষ্যমাত্রার বাইরে
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মধ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩০-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল।

তবে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে গড়ে প্রতি ৩৭ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন। অনেক বিদ্যালয়ে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।

প্রধান শিক্ষকসহ শত শত পদ খালি
শুধু সহকারী শিক্ষক নয়, বিদ্যালয় পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও বড় সংকট রয়েছে।

বর্তমানে—

১. সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়: ৭০২টি

২. প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য: ৩৮৩টি

৩. সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য: ২৪৯টি

৪. অনেক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

শিক্ষা প্রশাসনেও স্থবিরতা
মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরেও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদ।

বর্তমান পরিস্থিতি—

১. মাউশির উপপরিচালক পদ: ১০টির সবই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে পরিচালিত

২. জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা: ৬৪টির মধ্যে ২৩টি পদ শূন্য

৩. বিদ্যালয় পরিদর্শক: ১৬টির সব পদই খালি

৪. দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রমেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পদোন্নতি জটিলতায় হতাশ শিক্ষকরা
২০১৮ সালে সিনিয়র শিক্ষক নামে নবম গ্রেডের পদ সৃষ্টি করা হলেও ২০২১ সালের পর থেকে নতুন করে পদোন্নতি কার্যত বন্ধ রয়েছে। সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ বিভিন্ন পদেও নিয়মিত নিয়োগের পরিবর্তে চলতি দায়িত্বে কাজ করছেন অনেক শিক্ষক।

শিক্ষকদের অভিযোগ, বেতন-ভাতা তুলনামূলক কম হওয়ার পাশাপাশি সময়মতো পদোন্নতি না পাওয়ায় পেশাগত হতাশা বাড়ছে। এতে শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা হয়েছে। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বেশি।

সরকারের লক্ষ্য, ধাপে ধাপে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অবকাঠামো নয়, এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, গত দেড় দশকে বিদ্যালয়ের ভবন ও অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন হলেও শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি।

তাদের মতে, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন এবং যোগ্য শিক্ষকদের ধরে রাখার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন