জ্বর নেই মানেই সুস্থ নন ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল ফেজ নিয়ে সতর্কতা
ডেঙ্গুতে জ্বর কমে গেলেও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড় নজর রাখা জরুরি।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জ্বর কমে গেলে অনেক পরিবারই ধরে নেন, রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, জ্বর কমার সময়টিই অনেক ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, ডেঙ্গুর গুরুতর রূপে ক্রিটিক্যাল ফেজ সাধারণত অসুস্থতার ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে দেখা দিতে পারে এবং এ সময় শরীরের তাপমাত্রা কমলেও রোগী যে সুস্থ হয়ে উঠছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সম্প্রতি ডেঙ্গু নিয়ে সতর্ক করে চিকিৎসক ডা. নোবেলও জানিয়েছেন, জ্বর চলে যাওয়ার পর রোগীর শারীরিক অবস্থার দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুর প্রথম পর্যায়ে কয়েক দিন জ্বর থাকতে পারে। এরপর জ্বর কমার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা রোগীর জন্য বিশেষ সতর্কতার সময় হতে পারে।
ডেঙ্গুর এই পর্যায়ে রক্তনালি থেকে তরল বের হয়ে যাওয়ার কারণে শরীরে রক্তের কার্যকর পরিমাণ কমে যেতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ কমে শক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। WHO-ও জানিয়েছে, গুরুতর ডেঙ্গুতে প্লাজমা লিকেজের কারণে শক, গুরুতর রক্তপাত এবং অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তাই জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগীকে স্বাভাবিক মনে হলেও পর্যবেক্ষণ বন্ধ করা ঠিক নয়। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া, রক্তবমি বা কালো পায়খানা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, প্রচণ্ড তৃষ্ণা কিংবা হাত-পা ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। WHO এসব লক্ষণকে গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা দীর্ঘ সময় প্রস্রাব না হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকাতেও প্রস্রাব কমে যাওয়া, ঠান্ডা ও ঘামযুক্ত ত্বক, তীব্র পেটব্যথা, রক্তপাত এবং কালো পায়খানার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রবণতাও রয়েছে। তবে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখেই রোগীর অবস্থা বিচার করা উচিত নয়। গুরুতর ডেঙ্গুতে চিকিৎসকদের জন্য রোগীর রক্তক্ষরণ, তরল বের হয়ে যাওয়া, রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু প্লাটিলেট বাড়ানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।
ব্যথা বা জ্বর কমানোর ওষুধের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। WHO ডেঙ্গুতে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো NSAID এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জ্বর বা ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য ওষুধ বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
ডেঙ্গুতে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। পানি, ওরস্যালাইন ও অন্যান্য উপযুক্ত তরল গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে গুরুতর অবস্থায় নিজে থেকে অতিরিক্ত তরল বা কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা শুরু না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া উচিত। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সর্বশেষ গাইডলাইনও এ বিষয়ে চিকিৎসকদের জন্য নির্দেশনা দিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বর কমে যাওয়া মানেই ডেঙ্গু শেষ—এমন ধারণা করা যাবে না। বিশেষ করে জ্বর কমার পরের সময়টিতে রোগীর আচরণ, শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্তপাত, পেটের সমস্যা, প্রস্রাবের পরিমাণ ও শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে হবে। কোনো সতর্কসংকেত দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে নিতে হবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
