বাংলা কিউআরে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনে প্রণোদনা সুবিধা পাবে

প্রকাশিত: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫৪ অপরাহ্ণ
বাংলা কিউআরে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনে প্রণোদনা সুবিধা পাবে

বাংলা কিউআরে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনে প্রণোদনা

দেশে ডিজিটাল লেনদেন আরও বাড়াতে বাংলা কিউআরভিত্তিক পেমেন্টে নতুন সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ বা এনপিএসবি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট অ্যাকোয়ারিং ও ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা দেওয়া হবে। নতুন এই সুবিধার আওতা শুধু ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ী বা সেবাদাতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বৈধ ট্রেড লাইসেন্সধারী অন্যান্য মার্চেন্ট পয়েন্টও এর আওতায় এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট ২৭ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্দেশনা অনুযায়ী, এনপিএসবি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া অনূর্ধ্ব ২ হাজার টাকার প্রতিটি বাংলা কিউআর লেনদেনের বিপরীতে অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠান লেনদেনের ০.১০ শতাংশ এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান ০.২০ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাবে। এই প্রণোদনা মাসিক ভিত্তিতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সহজভাবে বললে, কোনো গ্রাহক যদি একটি দোকানে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে ২ হাজার টাকা পরিশোধ করেন, তাহলে ওই লেনদেনের বিপরীতে অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠানের জন্য ২ টাকা এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠানের জন্য ৪ টাকা হিসেবে প্রণোদনা দাঁড়াবে। অর্থাৎ দুই প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্মিলিত প্রণোদনার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৬ টাকা হতে পারে। তবে এই অর্থ সরাসরি গ্রাহক বা দোকানদারের হাতে নগদ প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে না; এটি সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট অবকাঠামোর প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত প্রণোদনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্তের বড় পরিবর্তন এসেছে সুবিধাভোগী মার্চেন্টের পরিধিতে। এর আগে আগস্টে জারি করা নির্দেশনায় ব্যক্তিগত খুচরা হিসাবের মাধ্যমে যুক্ত হওয়া ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পণ্য বিক্রেতা এবং সেবাদাতাদের বাংলা কিউআর লেনদেনকে এই প্রণোদনা কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছিল। নতুন নির্দেশনায় বৈধ ট্রেড লাইসেন্সধারী অন্যান্য মার্চেন্ট পয়েন্টকেও এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে ছোট দোকান থেকে শুরু করে বৈধ ট্রেড লাইসেন্স থাকা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনের এই সুবিধার আওতায় আসতে পারবে।

নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে। একই সময় থেকে বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় আরও কিছু পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে মার্চেন্টদের জন্য বাংলা কিউআর পেমেন্টের অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে হিসাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত ১ শতাংশ ন্যূনতম মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর তুলে দেওয়া হয়েছে এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠানের ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি বা আইআরএফ শূন্য করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক ও পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে বাংলা কিউআর সেবা বিনা মূল্যে অথবা নামমাত্র খরচে দিতে পারবে।

বাংলা কিউআর হলো এমন একটি আন্তঃপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কিউআর পেমেন্ট ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও পেমেন্ট সেবা ব্যবহার করে গ্রাহক কোনো মার্চেন্টকে ডিজিটালভাবে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশের বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ী ও সেবাদাতাকে একটি আন্তঃসংযুক্ত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সারাদেশে বাংলা কিউআর কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের পেছনে ছোট ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় যুক্ত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় ছোট দোকান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, স্থানীয় সেবাদাতা বা ছোট মার্চেন্টদের অনেকের কাছেই ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গ্রহণের খরচ ও জটিলতা একটি বাধা হতে পারে। বাংলা কিউআরকে সহজলভ্য করা এবং মার্চেন্ট পর্যায়ে খরচ কমানোর মাধ্যমে এসব ব্যবসায়ীকে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করাই নতুন ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলা কিউআর ব্যবহারের পরিমাণও সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ বাংলা কিউআর লেনদেন হতো, যার আর্থিক মূল্য ছিল ২৮ কোটি টাকার বেশি। পরবর্তী সময়ে দৈনিক লেনদেন বেড়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখে পৌঁছেছে এবং দৈনিক লেনদেনের মূল্য প্রায় ১৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধির ধারাকে আরও গতিশীল করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্য কাঠামো ও প্রণোদনায় পরিবর্তন আনছে।

তবে প্রণোদনার পাশাপাশি লেনদেন ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতেও বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু শর্ত রেখেছে। প্রকৃত একটি বড় লেনদেনকে ইচ্ছাকৃতভাবে কয়েকটি ছোট লেনদেনে ভাগ করে প্রণোদনা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। একইভাবে ব্যর্থ, বাতিল, ফেরত, চার্জব্যাক বা বিরোধপূর্ণ লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রণোদনা পাওয়ার নিয়ম প্রযোজ্য নয়। পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেনদেনের সঠিক রেকর্ড সংরক্ষণ এবং অস্বাভাবিক লেনদেনের ধরন পর্যবেক্ষণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

গ্রাহকদের জন্যও বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় আরও পরিবর্তন আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নভেম্বর থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যক্তিপর্যায়ে টাকা পাঠানোর সুবিধাও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে শুধু দোকানে পণ্য বা সেবার মূল্য পরিশোধ নয়, আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত লেনদেনেও বাংলা কিউআর ব্যবহারের সুযোগ বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, বাংলা কিউআর ব্যবহারে নতুন প্রণোদনা এবং মার্চেন্টদের জন্য খরচ কমানোর উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার একটি পদক্ষেপ। বিশেষ করে এখন বৈধ ট্রেড লাইসেন্সধারী সব ধরনের মার্চেন্ট পয়েন্টকে প্রণোদনা কাঠামোর আওতায় আনার ফলে ছোট-বড় আরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাংলা কিউআর গ্রহণে আগ্রহী হতে পারে। তবে এই সুবিধা বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে মার্চেন্টদের কাছে সেবা সহজলভ্য হওয়া, লেনদেনের খরচ, নির্ভরযোগ্যতা এবং গ্রাহকদের মধ্যে বাংলা কিউআর ব্যবহারের প্রবণতা কতটা বাড়ে তার ওপর।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page