ভারতে একের পর এক ঐতিহাসিক মসজিদ ভাঙার হিড়িক
ভারতের উজ্জয়িনীতে শাহী মসজিদের অংশ অপসারণ ঘিরে বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ।
ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় শতাব্দীপ্রাচীন শাহী মসজিদের একটি অংশ অপসারণকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় ১৫ জনকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রোববার রাতে মসজিদের কাছে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ অবস্থান নেন। পরদিন সকালে সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য নির্ধারিত অংশ অপসারণের কাজ শুরু হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশের দিকে পাথর ছোড়ে বলে পুলিশের অভিযোগ। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করে।
উজ্জয়িনীর পুলিশ সুপার প্রদীপ শর্মা জানিয়েছেন, সংঘর্ষের ঘটনায় ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে এবং সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পুলিশ সিসিটিভি ও ড্রোনের ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংঘর্ষে জড়িতদের শনাক্ত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানোর বিষয়ও তদন্ত করা হচ্ছে।
প্রশাসনের ভাষ্য, পুরো শাহী মসজিদ অপসারণ করা হচ্ছে না। সড়ক প্রশস্তকরণের নির্ধারিত অংশের মধ্যে পড়া মসজিদের একটি ছোট অংশই সরানো হচ্ছে। উজ্জয়িনীর কালেক্টর রোশন সিং বলেছেন, মসজিদ কমিটির সম্মতিতেই ওই অংশ অপসারণের কাজ চলছে।
উজ্জয়িনী শহরে ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভকে সামনে রেখে সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে কান্থাল ক্রসিং থেকে গোপাল মন্দির পর্যন্ত প্রায় ৯০০ মিটার সড়ক ১৫ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর চলাচল ও যানবাহন ব্যবস্থাপনা সহজ করতেই এই কাজ করা হচ্ছে।
পুলিশ ও পৌর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সড়ক প্রশস্তকরণের আওতায় পড়া মসজিদের অংশটি মোট মসজিদ চত্বরের ১০ শতাংশেরও কম। একই প্রকল্পে অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনাসহ বিভিন্ন স্থাপনাও অপসারণের আওতায় রয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দা ও মসজিদ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মসজিদের অংশ অপসারণের বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাদের দাবি, মসজিদ অক্ষত রেখে সড়কের বিপরীত পাশ থেকে জমি নিয়ে রাস্তা প্রশস্ত করার বিকল্প রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কয়েক দফা আলোচনা ও আইনি লড়াইও হয়েছে।
বিরোধটি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ৯ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চ মসজিদের অংশ অপসারণ ঠেকাতে করা আবেদন খারিজ করে দেয়। পরে সোমবার মুসলিম পক্ষের করা দুটি আপিলও নিষ্পত্তি করা হয়। আদালতে জানানো হয়, মসজিদ কমিটি ও প্রশাসনের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে সড়কের নির্ধারিত অংশে থাকা স্থাপনা সরানোর কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আদালতের কার্যক্রমে পৌর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে মসজিদের ১০ শতাংশের কম অংশ প্রভাবিত হবে। প্রকল্পটির বৃহত্তর পরিসরে বিপুলসংখ্যক স্থাপনা এবং ধর্মীয় স্থানের অংশও অপসারণের আওতায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সংঘর্ষের পর উজ্জয়িনীর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত ও এর উৎস খুঁজে বের করার কাজ চলছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো মসজিদ ভেঙে ফেলা হচ্ছে—এমন দাবি করে কিছু ভুয়া বা কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর পর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, বাস্তবে সড়ক প্রশস্তকরণের আওতায় পড়া অংশটিই অপসারণ করা হচ্ছে।
শাহী মসজিদের অংশ অপসারণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের পর স্থানীয় ধর্মীয় নেতারাও মানুষকে গুজবে কান না দেওয়ার এবং ঘটনাস্থলে অপ্রয়োজনে জড়ো না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে প্রশাসন ২০২৮ সালের সিংহস্থকে সামনে রেখে উন্নয়নকাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে।
সূত্র: আল জাজিরা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
