জ্বালানির দামে ‘সংক্রমণ’, জ্বরে কাঁপছে নিত্যপণ্যের বাজার

প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩২ অপরাহ্ণ
জ্বালানির দামে ‘সংক্রমণ’, জ্বরে কাঁপছে নিত্যপণ্যের বাজার

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির আভাস মিলেছিল সর্বশেষ পরিসংখ্যানে। টানা তিন মাস কমেছে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি। কিন্তু এর মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় সেই স্বস্তি আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এরই মধ্যে নিত্যপণ্যের বাজারে বাড়তে শুরু করেছে কয়েকটি পণ্যের দাম। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ব্যয়ও বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুলাইয়ের ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে আগস্টে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। মে মাসে এই হার ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৪২ ও ৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

তবে মূল্যস্ফীতির এই নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যেই ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দরে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত পড়ছে পরিবহন খাতে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পণ্য পরিবহনে বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে। সেই অতিরিক্ত খরচ যোগ হচ্ছে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামে। রাজধানীর বাজারেও এরই মধ্যে আটা, ময়দা, চাল, ভোজ্যতেল, সবজি, ডিম ও তরল দুধের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদনে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে আটা, ময়দা ও চালের দাম বাড়ার তথ্যও উঠে এসেছে।

সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বেগুনের দাম সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কাঁচামরিচের দামও ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। খোলা আটা-ময়দার দাম বেড়েছে প্রায় ৫ টাকা করে।

ভোজ্যতেলের বাজারেও চাপ রয়েছে। খোলা সয়াবিন ও পাম তেল বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ডিমের দামও বেড়েছে। আগে ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হওয়া ফার্মের বাদামি ডিমের এক ডজন এখন ১৫০ টাকায় উঠেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি কোম্পানিগুলো তরল দুধের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়িয়েছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরেও কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ার চিত্র পাওয়া গেছে। সংস্থাটির হিসাবে, সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে পাম ও পাম সুপার তেল, বোতলজাত সয়াবিন তেল, খোলা আটা-ময়দা, মাঝারি মানের চাল, বড় দানার মসুর ডাল, বেগুন, কাঁচামরিচ ও ডিমের দামে পরিবর্তন এসেছে।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু সরাসরি জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও পণ্য উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে ব্যয় বাড়ায় শেষ পর্যন্ত তার চাপ গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রে ‘ছোঁয়াচে’ প্রভাব তৈরি করতে পারে। বাড়তি খরচের পাশাপাশি কেউ কেউ অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারেন। ফলে এই প্রভাব যেন সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য সরকারের নজরদারি প্রয়োজন।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, জ্বালানির দাম বাড়লেও নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব সীমিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারেন। এ কারণে উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে একবারে জ্বালানির দাম এতটা বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাঁর পরামর্শ, পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা জোরদার করা প্রয়োজন।

এরই মধ্যে বাজারে বাড়তি খরচের চাপ অনুভব করছেন ক্রেতারা। বাসাবোর বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মোস্তাক আহমেদ বলেন, চাল, ডাল, তেল ও মসলার দাম বাড়ায় মাসিক বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মাছ-মাংস কেনা কমানোর পর ডিম ও দুধের দাম বাড়ায় খাদ্য তালিকাতেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে।

কদমতলীর দিনমজুর মোতাহার মিয়ার অভিজ্ঞতাও একই। তাঁর ভাষ্য, দাম বাড়তে থাকায় একের পর এক প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কমাতে হচ্ছে। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেই আয় শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যদি পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত অন্যান্য পণ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সাম্প্রতিক সময়ে কমতে থাকা মূল্যস্ফীতির প্রবণতা আবারও বাধার মুখে পড়তে পারে। তাই বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো এবং সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page