প্রতিবেশী দেশে পাচার রোধেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে: প্রতিমন্ত্রী
জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের কারণ ব্যাখ্যা করছেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ও বিমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছিল। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করায় বিপিসিকে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। এই হিসাবে ছয় মাসে প্রতি মাসে গড়ে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি আমদানির খরচ আরও বেড়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় আগের দামে জ্বালানি বিক্রি করে বিপিসির ওপর তৈরি হওয়া আর্থিক চাপ আর বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। সরকার শুরুতে দাম সমন্বয় না করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে একপর্যায়ে মূল্য সমন্বয় ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য সহজ বা কাঙ্ক্ষিত ছিল না। তবে বিপিসির ক্রমবর্ধমান লোকসান, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিস্থিতি এবং আমদানি ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করে। এর মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ প্রায় ৪৫ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম প্রায় ১৭০ টাকা হলেও দাম সমন্বয়ের আগে দেশে ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল ১১৫ টাকায়। ফলে প্রতি লিটারে প্রায় ৫৫ টাকা ঘাটতি বিপিসিকে বহন করতে হচ্ছিল।
সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসিকে প্রায় ১৫ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তাঁর ভাষ্য, দাম সমন্বয় না করা হলে শুধু ডিজেলের ক্ষেত্রেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান বা ভর্তুকির প্রয়োজন হতো। সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে সেই পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারত।
এত বড় অঙ্কের ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সরকারের অন্যান্য খাতে ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও জরুরি জনসেবার অর্থায়নে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে জানান তিনি।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হলে প্রতিবন্ধী ও বিধবাদের ভাতা, নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ড, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মতো খাতে সরকারি ব্যয় চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি এবং সরকারের অন্যান্য জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন ছিল।
জ্বালানি তেলের দামের পার্থ্যের বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম প্রায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৩৮ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা এবং পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা। এর তুলনায় বাংলাদেশে দাম কম থাকায় সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করা জ্বালানি যদি সীমান্তপথে প্রতিবেশী দেশে পাচার হয়ে যায়, তাহলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হবে। তাই সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের একটি উদ্দেশ্য ছিল জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি কমানো এবং আমদানিতে ব্যয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ঠেকানো।
তিনি বলেন, জ্বালানির দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে শুধু বিপিসির আর্থিক লোকসান কমানোর বিষয়টি জড়িত নয়। এর সঙ্গে জ্বালানি পাচার রোধ, বৈদেশিক মুদ্রার সঠিক ব্যবহার এবং সরকারের সামাজিক সুরক্ষা ও জরুরি জনসেবায় ব্যয়ের সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়ও বিবেচনা করা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারের বিবেচনা করা পরিস্থিতি সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
