ভাঙা পিঠ-কাঁধ নিয়ে যেভাবে ইরানি পাহাড়ে ৫০ ঘণ্টা লুকিয়ে ছিলেন মার্কিন সেনা

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ
ভাঙা পিঠ-কাঁধ নিয়ে যেভাবে ইরানি পাহাড়ে ৫০ ঘণ্টা লুকিয়ে ছিলেন মার্কিন সেনা

ইরানে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর প্রায় ৫০ ঘণ্টা পাহাড়ে আহত অবস্থায় ছিলেন মার্কিন বিমানবাহিনীর এক কর্নেল

ইরানে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর প্রায় ৫০ ঘণ্টা আহত অবস্থায় পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন মার্কিন বিমানবাহিনীর এক কর্নেল। ভাঙা পিঠ, হাত ও কাঁধের চোট নিয়েও উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে তাঁকে। অবশেষে দীর্ঘ অভিযানের পর ইরান থেকে নিরাপদে বের করে আনা হয় তাঁকে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া প্রথম প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে ওই কর্মকর্তা তাঁর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁর প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি। মিশন কলসাইন ‘ব্রাভো’ নামে পরিচিত এই কর্মকর্তা ছিলেন দুই আসনের এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২ এপ্রিল ইরানের ইসফাহানের কাছে একটি অভিযানের সময় বিমানটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়। ‘ডুড ৪৪’ নামে পরিচিত ওই যুদ্ধবিমানটি ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্প স্থাপনায় হামলার মিশনে ছিল।

ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের পর বিমানের দুই ক্রু সদস্যই বের হয়ে প্যারাসুটে নামার চেষ্টা করেন। তবে আকাশে নামার সময় ব্রাভো ও বিমানের পাইলট ‘আলফা’ একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।

এরপর ব্রাভোর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তাঁর প্যারাসুট ঠিকমতো খুলতে ব্যর্থ হয়। ফলে ঘণ্টায় আনুমানিক ৭০ থেকে ১০০ মাইল বেগে তিনি মাটির দিকে পড়ে যান। পাহাড়ি মরুভূমিতে আছড়ে পড়ার পর পিঠ, হাত ও কাঁধে গুরুতর আঘাত পান তিনি।

‘৬০ মিনিটস’-কে ব্রাভো বলেন, একসময় ওপরের দিকে তাকিয়ে যখন তিনি দেখতে পান প্যারাসুট নেই, সেটিই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত।

গুরুতর আহত হলেও দুর্ঘটনাস্থলে অবস্থান না করে সেখান থেকে সরে যান ব্রাভো। পরে প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে ভূখণ্ডের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন। সেখানে বসেই তিনি প্রার্থনা করেন এবং উদ্ধার পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করতে থাকেন।

এদিকে ব্রাভোর অবস্থান থেকে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে অবতরণ করেছিলেন পাইলট আলফা। মার্কিন বাহিনী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে খুঁজে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও ব্রাভোর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে উদ্ধারকারী দলকে ফিরে যেতে হয়।

এরপর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শুরু হয় নতুন করে অনুসন্ধান। কারণ একই এলাকায় ইরানি বাহিনীও ভূপাতিত মার্কিন বিমানকর্মীদের খুঁজছিল। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে যুদ্ধবিমান হারানোর খবর জানানোর পর তিনি ক্রুদের উদ্ধারে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন। সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য হিসেবে বলা হয়, তাঁরা জীবিত থাকুন বা না থাকুন, তাঁদের ফিরিয়ে আনা হবে।

মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, ইরানি স্থলবাহিনী ব্রাভোর অবস্থান থেকে মাত্র কয়েকশ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল। ফলে আহত অবস্থায় তাঁর সেখানে থাকা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একপর্যায়ে ব্রাভো মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন। তিনি জানান, আহত হলেও তিনি তখনও চলাফেরা করতে পারছেন। এরপর তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু হয়।

সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, সিআইএ গোয়েন্দা তথ্য ও একটি বিভ্রান্তিমূলক অভিযান ব্যবহার করে ব্রাভোর অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। উদ্ধার অভিযান শুরুর আগে তিনি যে এলাকায় লুকিয়ে ছিলেন, তার কাছাকাছি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর একটি অবস্থানে মার্কিন হামলা চালানো হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্ধার অভিযানে মাটিতে ৯০ জনের বেশি মার্কিন সেনা অংশ নেন। আকাশপথে আরও কয়েকশ সদস্য এবং সহায়তায় কয়েক হাজার সেনা যুক্ত ছিলেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছাতে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী বিমান এবং ছোট হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়।

প্রায় ৫০ ঘণ্টা একা ও আহত অবস্থায় থাকার পর শেষ পর্যন্ত ব্রাভো উদ্ধারকারী দলকে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখেন। সেই মুহূর্তকে তিনি জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। উদ্ধারকারীরা তাঁর কাছে পৌঁছালে তাঁর মুখে ছিল মাত্র দুটি শব্দ—‘চলুন’।

তবে এরপরও অভিযান পুরোপুরি শেষ হয়নি। সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, দুটি মার্কিন বিমান একটি অস্থায়ী মরুভূমির রানওয়েতে অবতরণ করার পর বালিতে আটকে যায়। সংবেদনশীল সামরিক সরঞ্জাম ইরানের হাতে পড়ার আশঙ্কায় আটকে পড়া বিমান ও হেলিকপ্টারগুলো পরে মার্কিন বাহিনী ধ্বংস করে দেয়।

অবশেষে ইস্টার সানডের সূর্য ওঠার সময় ব্রাভোকে ইরান থেকে নিরাপদে বের করে আনা হয়। যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার প্রায় ৫০ ঘণ্টা পর শেষ হয় তাঁর আহত অবস্থায় পাহাড়ে লুকিয়ে থাকার সেই ভয়াবহ অপেক্ষা এবং দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান।

তথ্যসূত্র: মিন্ট

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page