স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নতুন ছক সাজাচ্ছে বিএনপি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকিয়ে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। বিভিন্ন ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে দলীয় সমর্থন পেতে একাধিক নেতা মাঠে নামায় ভোট ভাগাভাগি ও অভ্যন্তরীণ বিভেদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শুরুতেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সমন্বয় করে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একজনকে দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়ার কৌশল নিয়েছে বিএনপি।
দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় একই এলাকার একাধিক বিএনপি নেতা স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে প্রত্যেকেই নিজেদের দলসমর্থিত প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। ফলে বিএনপির ভোট বিভক্ত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সুবিধা পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে এরই মধ্যে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির ঘরানার অন্তত নয়জন নেতা বা সমর্থকের আগ্রহের কথা সামনে এসেছে। ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মীর মোশাররফ হোসেন (মানিক), সদস্যসচিব শাহ আলম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক নিজামুদ্দিন, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ফখরুল ইসলাম (মাসুক), উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন এবং ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম মহিউদ্দিন ভূঁইয়াসহ কয়েকজন এ দৌড়ে রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোটবী ইউনিয়নে দীর্ঘদিনের স্থানীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি নতুন করে আরও কয়েকজনের তৎপরতা বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার বিষয়টি সামনে এনেছে। দলটির জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, একাধিক আগ্রহী প্রার্থীর মধ্যে সমঝোতা করে এমন একজনকে সামনে আনা, যাকে অন্যরা মেনে নিয়ে নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন।
এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু ফেনীর মোটবী ইউনিয়নে নয়, আরও বিভিন্ন ইউনিয়নে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগ্রহ বেড়েছে। কোথাও সাবেক জনপ্রতিনিধিরা আবার মাঠে সক্রিয় হচ্ছেন, কোথাও নতুন মুখ নিজেদের অবস্থান শক্ত করছেন। এর ফলে প্রার্থী বাছাইকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে বিভিন্ন সাংগঠনিক বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থীর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। দলীয় ঐক্য বজায় রেখে একজন প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও মহানগর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও তিনি এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন।
দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামত ও সম্ভাব্য প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একজনকে দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়ার কথা জানান তিনি।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ফলে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর মধ্যে আলোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর একজনকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা থাকবে। কেউ শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় বিএনপির জন্য পরিস্থিতিটি কিছুটা ভিন্ন। জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থীকে কেন্দ্র করে যে সাংগঠনিক কাঠামো কাজ করে, স্থানীয় নির্বাচনে প্রতীক না থাকায় সেখানে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, স্থানীয় প্রভাব ও নিজস্ব ভোটব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে দলীয় সমর্থন পাওয়া প্রার্থীর পাশাপাশি অন্য বিএনপি নেতারা মাঠে থাকলে ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে সম্ভাব্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের শুরুতেই আলোচনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের অনুসারীদের দলীয়ভাবে সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে কি না, তা এখনো সর্বত্র স্পষ্ট নয়।
তৃণমূলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপও অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন ইউনিয়নে নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়, স্থানীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন আগ্রহী নেতারা। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থান স্পষ্ট—একই এলাকায় দলের একাধিক প্রার্থীকে কেন্দ্র করে বিভক্তি তৈরি না করে শেষ পর্যন্ত একজন প্রার্থীর পক্ষে সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখা হবে।
দলের নেতারা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় নয়, এটি তৃণমূলের সাংগঠনিক ঐক্য ও শৃঙ্খলারও পরীক্ষা। তাই প্রার্থী বাছাই থেকে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পর্যন্ত কেন্দ্র ও স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
