গরুর দুধের চেয়ে তিন গুণ বেশি শক্তি, ‘আরশোলার দুধ’ নোবেল পেলেন বিজ্ঞানীরা
আরশোলার দুধের প্রোটিন ক্রিস্টাল নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের আইজি নোবেল পেয়েছেন গবেষকেরা।
শুনতে অবাক লাগলেও ‘আরশোলার দুধ’ নিয়ে করা গবেষণাই এবার পেয়েছে ২০২৬ সালের আইজি নোবেল পুরস্কারের রসায়ন বিভাগে স্বীকৃতি। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ এক প্রজাতির আরশোলার দুধ থেকে তৈরি প্রোটিন ক্রিস্টালে সমপরিমাণ গরুর দুধের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি শক্তি থাকতে পারে। তবে এই তথ্যের অর্থ এই নয় যে মানুষের জন্য আরশোলার দুধ পান করার উপযোগী বা বাজারজাত দুধের বিকল্প হিসেবে এটি প্রস্তুত হয়ে গেছে।
যে আরশোলার কথা বলা হচ্ছে, সেটি সাধারণ ঘরের আরশোলা নয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Diploptera punctata, পরিচিত নাম প্যাসিফিক বিটল ককরোচ। এটি অন্য অনেক আরশোলার মতো ডিম পাড়ে না; বরং মায়ের শরীরের ভেতরে ভ্রূণের বিকাশ ঘটে এবং জন্মের আগে তাদের পুষ্টি জোগাতে বিশেষ ধরনের দুধসদৃশ পদার্থ সরবরাহ করা হয়।
এই ‘দুধ’ আসলে স্তন্যপায়ী প্রাণীর দুধের মতো নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি পানি, প্রোটিন, অ্যামিনো অ্যাসিড, কার্বোহাইড্রেট ও লিপিডের সমন্বয়ে তৈরি একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ তরল। ভ্রূণ এই পদার্থ গ্রহণ করার পর তার অন্ত্রে দুধের প্রোটিন থেকে তৈরি বিশেষ ক্রিস্টাল জমা হয়। এসব ক্রিস্টাল ভ্রূণের বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করে।
গবেষণাটির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক উঠে আসে ওই প্রোটিন ক্রিস্টালের শক্তি বিশ্লেষণে। ২০১৬ সালে International Union of Crystallography Journal-এ প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এক্স-রে ম্যাক্রোমলিকিউলার ক্রিস্টালোগ্রাফি ব্যবহার করে ক্রিস্টালের গঠন বিশ্লেষণ করেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, একটি ক্রিস্টালে সমপরিমাণ দুগ্ধজাত দুধের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি শক্তি থাকতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই ক্রিস্টাল মূলত লিপিডের সঙ্গে যুক্ত বিশেষ দুধ-প্রোটিন দিয়ে তৈরি। অত্যন্ত ঘনভাবে সাজানো এই প্রোটিন কাঠামো আরশোলার ভ্রূণকে কম জায়গায় বেশি পরিমাণ পুষ্টি সংরক্ষণের সুযোগ দেয়। ফলে মায়ের শরীরের ভেতরে দ্রুত বেড়ে ওঠা ভ্রূণের জন্য এটি কার্যকর একটি পুষ্টির উৎস হিসেবে কাজ করে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। গবেষণায় ‘গরুর দুধের চেয়ে তিন গুণ বেশি পুষ্টি’—এমন সরল দাবি করা ঠিক নয়। মূল গবেষণায় তুলনাটি করা হয়েছে শক্তির পরিমাণের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ সমপরিমাণ ভরের ক্রিস্টালে গরুর দুধের তুলনায় তিন গুণের বেশি শক্তি পাওয়া যেতে পারে। এটি মানুষের জন্য পানযোগ্য বা স্বাস্থ্যগতভাবে গরুর দুধের চেয়ে তিন গুণ ভালো—এমন কোনো সিদ্ধান্ত গবেষণাটি দেয়নি।
এই গবেষণায় ভারত, ফ্রান্স, জাপান, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা যুক্ত ছিলেন। ২০২৬ সালের আইজি নোবেল পুরস্কারের রসায়ন বিভাগে পুরো গবেষক দলকে সম্মানিত করা হয়। অনুষ্ঠানে দলের পক্ষে লিওনার্ড ‘লিও’ চাভাস, সুব্রহ্মণ্যন রামস্বামী এবং নাথান কাউসেন্স পুরস্কার গ্রহণ করেন।
আইজি নোবেল এমন গবেষণাকে স্বীকৃতি দেয়, যা প্রথমে মানুষকে হাসায় বা অবাক করে, পরে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। ২০২৬ সালের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সুইৎজারল্যান্ডের জুরিখে অনুষ্ঠিত হয়। এবারই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এ পুরস্কারের আয়োজন করা হলো।
আরশোলার দুধ নিয়ে গবেষণা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। বহু বছর ধরে Diploptera punctata-এর মাতৃসুলভ পুষ্টি সরবরাহ নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। ১৯৭৭ সালের একটি গবেষণাতেও এই আরশোলার দুধসদৃশ নিঃসরণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও লিপিড থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
পরবর্তী গবেষণায় এই অদ্ভুত পুষ্টি ব্যবস্থার আণবিক কাঠামো আরও পরিষ্কার হয়েছে। বিজ্ঞানীদের আগ্রহের মূল জায়গা হলো, কীভাবে একটি পোকা তার ভ্রূণের জন্য এত ঘন ও শক্তিসমৃদ্ধ পুষ্টি তৈরি ও সংরক্ষণ করে। তাই গবেষণাটির গুরুত্ব মানুষের খাবার হিসেবে ‘আরশোলার দুধ’ চালু করার চেয়ে জীববিজ্ঞান, প্রোটিন কাঠামো ও পুষ্টি সংরক্ষণের প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে বেশি।
অর্থাৎ, ‘আরশোলার দুধ’ এখনই মানুষের জন্য নতুন কোনো দুধের বিকল্প নয়। বরং একটি বিশেষ প্রজাতির আরশোলার ভ্রূণ কীভাবে অত্যন্ত ঘন পুষ্টি গ্রহণ ও সংরক্ষণ করে, সেই অসাধারণ জৈবিক প্রক্রিয়াই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্র। আর সেই অদ্ভুত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাই এবার জায়গা করে নিয়েছে আইজি নোবেলের মঞ্চে।
সূত্র: TV9 Bangla
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
