পাঁচ টাকার নোটে থাকা কুসুম্বা মসজিদের বেহাল দশা, সংস্কার ও নিরাপত্তা চান দর্শনার্থীরা
ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদের সংস্কার ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবি
নওগাঁর মান্দা উপজেলার ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ও দর্শনীয় স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। প্রায় পাঁচ শতাব্দীর পুরোনো এই মসজিদটি এর অনন্য স্থাপত্যশৈলীর কারণে একসময় বাংলাদেশের পাঁচ টাকার নোটেও স্থান পেয়েছিল। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুসল্লি, পর্যটক ও দর্শনার্থীরা কুসুম্বা মসজিদ দেখতে আসেন। বিশেষ করে শুক্রবার, ঈদ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় দর্শনার্থী ও মুসল্লির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। কিন্তু বিপুল মানুষের উপস্থিতির তুলনায় অজুখানা, টয়লেট, বিদ্যুৎ, নামাজের জায়গা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয় বলে তারা মনে করছেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মান্দা উপজেলার কুসুম্বা এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদটি সুলতান গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহের শাসনামলে সোলায়মান নামে এক ব্যক্তি ১৫৫৮ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ করেন। মসজিদটির আয়তাকার কাঠামোতে ছয়টি গম্বুজ রয়েছে এবং দেয়ালের উভয় পাশে পাথরের আবরণসহ এর স্থাপত্যে রয়েছে বিশেষ নান্দনিক বৈশিষ্ট্য।
ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে কুসুম্বা মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। মসজিদটির ছবি বাংলাদেশের পাঁচ টাকার একটি কারেন্সি নোটের পেছনের অংশে ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে ২০২৫ সালে নতুন পাঁচ টাকার নোটের নকশা থেকে কুসুম্বা মসজিদের ছবি বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে নওগাঁর মান্দায় প্রতিবাদ ও পুনর্বহালের দাবি উঠেছিল। ফলে ‘পাঁচ টাকার নোটের কুসুম্বা মসজিদ’ নামটি এখনো মানুষের কাছে এর পরিচিতির একটি অংশ হয়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, মসজিদে জুমার নামাজ, ঈদসহ নিয়মিত সময়ে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি সমবেত হন। মসজিদের ভেতরের জায়গা সীমিত হওয়ায় অনেক সময় সামনের খোলা চত্বরেও নামাজ আদায় করতে হয়। দর্শনার্থীদের চাপ বিবেচনায় অজু ও টয়লেটের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নামাজের জায়গা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা উন্নত করা প্রয়োজন।
কুসুম্বা মসজিদকে ঘিরে পর্যটকদের জন্য আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবিও দীর্ঘদিনের। দর্শনার্থীরা বলছেন, ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এলেও পর্যাপ্ত বসার জায়গা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত স্যানিটেশন ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনামূলক ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পান না।
এর পাশাপাশি মসজিদ প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সম্প্রতি জুমার নামাজের সময় এক নারী কয়েকজনের মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে ভুক্তভোগীরা বিষয়টি মসজিদের নিরাপত্তাকর্মীদের জানালে ওই নারীকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ঘটনাটির বিস্তারিত ও আইনগত অবস্থান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদ প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থাও আরও জোরদার করা দরকার। বিশেষ করে জুমা, ঈদ ও ছুটির দিনে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, সিসিটিভি নজরদারি এবং প্রবেশ ও বের হওয়ার জায়গায় পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হলে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা বাড়তে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা ঐতিহাসিক স্থাপনাটির যথাযথ সংরক্ষণ এবং পর্যটন সুবিধা বাড়াতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ চান। তাদের মতে, শুধু মূল স্থাপনা সংরক্ষণ করলেই হবে না, এর আশপাশের পরিবেশ, স্যানিটেশন, পানি, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুসুম্বা মসজিদ অতীতে সংস্কার করা হয়েছে এবং এটি দেশের সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একটি। তবে সময়ের সঙ্গে দর্শনার্থীর সংখ্যা ও প্রয়োজনীয়তা পরিবর্তিত হওয়ায় বর্তমান অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নতুন করে পর্যালোচনা করার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সংস্কার, পরিচ্ছন্নতা ও পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হলে কুসুম্বা মসজিদ আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এতে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি নওগাঁর পর্যটন সম্ভাবনাও আরও বাড়বে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
