পশুর নদীর পেটে বানিশান্তা, নদীভাঙনে বিলীনের পথে যৌনপল্লী

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ
পশুর নদীর পেটে বানিশান্তা, নদীভাঙনে বিলীনের পথে যৌনপল্লী

পশুর নদীর ভাঙনে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে খুলনার দাকোপের বানিশান্তা জনপদ।

মোংলার পশুর নদী যেন ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে খুলনার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা যৌনপল্লীকে। প্রতিদিন নদীভাঙনে কমছে বসতির পরিধি, ভাঙছে ঘরবাড়ি। প্রায় ১৩০ মানুষের এই জনপদে নিরাপদ আশ্রয়, সুপেয় পানি, শিক্ষা ও জীবিকার সংকট এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসনের সুযোগ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত তারা।

সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বানিশান্তায় নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ১৩০ মানুষের বসতি। এর মধ্যে নারী রয়েছেন প্রায় ৭০ জন। নদীভাঙনের পাশাপাশি যৌনপল্লীর ব্যবসায়ও মন্দা দেখা দিয়েছে। ক্রেতা কমে যাওয়ায় অনেক নারী অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের অনেকেই এই পেশা থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। কিন্তু নিরাপদ থাকার জায়গা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা না থাকায় সেই পথও অনিশ্চিত।

৬০ বছরের বেশি সময় বানিশান্তায় কাটিয়েছেন এক নারী। স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘদিন দোকান চালানোর পর স্বামী মারা গেলে এখন আমড়া ও শশা বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন। তার আক্ষেপ, জীবনের শেষ সম্বলটুকুও যদি নদী কেড়ে নেয়, তাহলে শেষ বয়সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন জানা নেই।

শুধু বসতিই নয়, নদীপথে যাতায়াতেও ভোগান্তিতে পড়ছেন এখানকার মানুষ। নৌকা ও বোটে যাত্রী চলাচল করলেও পশুর নদীর পাড়ে নৌযান ভেড়ানোর ভালো ব্যবস্থা নেই। এতে যাত্রী ওঠানামায় প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পশুর নদীর ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও নেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

এদিকে সুপেয় পানির সংকটও প্রকট। শিশুদের পড়াশোনার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। কর্মক্ষমতা হারানো বয়স্ক নারীদের জন্য নেই নিশ্চিত আয়ের ব্যবস্থা। ফলে নদীভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বোরহান উদ্দিন মিঠুন আমার দেশ কে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই নদীভাঙনের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। এ বিষয়ে এক্সএন ও জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি কয়েকটি সংস্থা বানিশান্তা এলাকায় কাজ করার কথা জানিয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন চিঠি আর আশ্বাসে কি রক্ষা পাবে বানিশান্তা? একটি জনপদ যখন চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে, তখন স্থায়ী নদীভাঙন প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনের দৃশ্যমান উদ্যোগ কোথায়?

বানিশান্তার বাসিন্দাদের দাবি, তারা দয়া নয়, বেঁচে থাকার অধিকার চান। চান নিরাপদ ঘর, সুপেয় পানি, শিশুদের শিক্ষা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা।

দ্রুত নদীর পাড়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা না হলে পশুর নদীতে শুধু ঘরবাড়িই নয়, হারিয়ে যেতে পারে একটি পুরো জনপদ। তখন প্রশাসনের খাতায় বানিশান্তা হয়তো একটি সংখ্যা হয়ে থাকবে কিন্তু সেই সংখ্যার পেছনে হারিয়ে যাবে শত মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও শেষ আশ্রয়।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page