মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে সম্মান জানাতে বিশেষ উদ্যোগ আর্জেন্টিনায়
মেসির সম্মানে ১০ মিনিটে থামবে সব ম্যাচ
আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্থা এএফএ এক ব্যতিক্রমী ও আবেগঘন সিদ্ধান্ত নিয়েছে—আসন্ন ম্যাচডে-তে দেশের পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগের সব প্রতিযোগিতার প্রতিটি ম্যাচ ১০ম মিনিটে থামিয়ে দেওয়া হবে, আর সেই মুহূর্তে গোটা মাঠজুড়ে বাজবে এক মিনিটের করতালি।
এই বিশেষ সম্মাননা উৎসর্গ করা হচ্ছে লিওনেল মেসির প্রতি, যিনি সম্প্রতি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে তার দীর্ঘ ও কিংবদন্তিতুল্য ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন। ম্যাচের ঠিক ১০ম মিনিটকে বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে একটি সরল অথচ গভীর কারণ—মেসি পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে বহন করেছেন সেই বিখ্যাত ১০ নম্বর, যা তাকে করে তুলেছে দলের প্রাণভোমরা এবং যুগের প্রতীক। এই সংখ্যাটি শুধু একটি জার্সি নম্বর নয়, বরং আর্জেন্টাইন ফুটবলের গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক—দিয়েগো মারাদোনার পর মেসিই সেই ঐতিহ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
মেসির অবসরের ঘোষণা এসেছে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের পর, যেখানে তিনি তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলেন। ২০০৫ সালের আগস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেক হওয়া এই কিংবদন্তি একুশ বছরের দীর্ঘ যাত্রা শেষে রেখে গেছেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রেকর্ড—২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল ও ৬৮টি অ্যাসিস্ট। তার গোলের হিসাব ভেঙে দেখলে দেখা যায়, প্রীতি ম্যাচে করেছেন ৫৪ গোল, দক্ষিণ আমেরিকার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ৩৬ গোল, বিশ্বকাপে ২১ গোল এবং কোপা আমেরিকায় ১৪ গোল।
ছয়টি টানা বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে—জার্মানি ২০০৬ থেকে শুরু করে ২০২৬ সংস্করণ পর্যন্ত—তিনি মোট ৩৪ ম্যাচে করেছেন ২১ গোল, যা তাকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। দলগত সাফল্যের দিক থেকেও তার অবদান অতুলনীয়—তিনি আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের ফিনালিসিমা, স্বপ্নের ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ শিরোপা এবং আরও একটি কোপা আমেরিকা ২০২৪ সালে। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ালেও ক্লাব পর্যায়ে তিনি থেমে যাননি—যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে ইন্টার মায়ামির জার্সিতে খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
এই বিদায়ে আর্জেন্টিনার ফুটবল মহল আবেগে ভাসছে। এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া মেসিকে অভিহিত করেছেন “আমাদের স্বপ্নের অধিনায়ক” বলে, আর জানিয়েছেন জাতীয় দলের জার্সি মেসির কাছে যেন একটি পতাকা, যার প্রতি দেশের মানুষের ভালোবাসা অটুট থাকবে চিরকাল। জাতীয় দলের সতীর্থরাও নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে ভোলেননি—এনজো ফের্নান্দেজ বলেছেন মেসিকে ছাড়া পরের ক্যাম্পে যাওয়ার কষ্টের কথা এবং তার কাছ থেকে শেখা জীবনের শিক্ষার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। লাউতারো মার্তিনেজ স্মরণ করেছেন মেসির কাছ থেকে শেখা হাল না ছাড়ার মানসিকতা, নীরবে পরিশ্রম করার অভ্যাস এবং সবসময় নিজের ওপর বিশ্বাস রাখার শিক্ষা। দীর্ঘদিনের মধ্যমাঠের সঙ্গী রদ্রিগো দে পল মেসিকে “সর্বকালের সেরা” বলে আখ্যা দিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এত আনন্দ উপহার দেওয়ার জন্য।
এই পটভূমিতেই এএফএ-র সিদ্ধান্তটি একটি প্রতীকী ও সমন্বিত জাতীয় শ্রদ্ধাঞ্জলি হয়ে উঠেছে। দেশজুড়ে যে ম্যাচডে অনুষ্ঠিত হবে, তার প্রতিটি মাঠে খেলা চলাকালীন ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় রেফারি খেলা থামিয়ে দেবেন, আর মাঠে উপস্থিত খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও দর্শকরা মিলে এক মিনিট ধরে করতালি দিয়ে মেসির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবেন। এরপর স্বাভাবিক নিয়মেই খেলা আবার শুরু হয়ে যাবে। আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিতে এমন প্রতীকী বিরতির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের সম্মান জানানোর রীতি নতুন নয়—অতীতে বিভিন্ন সময় ট্র্যাজেডি বা স্মরণীয় ঘটনার প্রেক্ষিতে নীরবতা পালনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। তবে মেসির মতো একজন জীবন্ত কিংবদন্তির অবসরকে ঘিরে এভাবে সারা দেশের সব প্রতিযোগিতা একযোগে অংশগ্রহণ করে করতালির মাধ্যমে উদযাপন করা নিঃসন্দেহে এক বিরল ও অনন্য ঘটনা।
সব মিলিয়ে এই আয়োজন কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়—এটি একটি জাতির পক্ষ থেকে তার সবচেয়ে প্রিয় সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য মুহূর্ত। মেসি যেভাবে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জার্সিকে বিশ্বমঞ্চে গর্বের প্রতীক করে তুলেছেন, তার প্রতিদানে এই ছোট্ট কিন্তু হৃদয়স্পর্শী উদ্যোগ দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে।
তথ্যসূত্র: ESPN
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
