যে দেশে ভুঁড়িওয়ালা পুরুষদের সৌন্দর্যে পাগল নারীরা!

প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ
যে দেশে ভুঁড়িওয়ালা পুরুষদের সৌন্দর্যে পাগল নারীরা!

বোডি জনগোষ্ঠীর কাছে বড় ভুঁড়ি শক্তি ও মর্যাদার প্রতীক।

আধুনিক বিশ্বের সৌন্দর্যের ধারণায় ছিপছিপে ও মেদহীন শরীরকে আকর্ষণীয় মনে করা হয়। ফ্যাশন, বিনোদন কিংবা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা—সব ক্ষেত্রেই অনেক সময় চিকন শরীরকে আদর্শ হিসেবে দেখা হয়। তবে পৃথিবীর সব সংস্কৃতিতে এই ধারণা এক নয়।

পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ‘বোডি’-র কাছে ঠিক এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। তাদের সমাজে একজন পুরুষের বড় আকৃতির ভুঁড়ি শুধু শরীরের গঠন নয়, বরং শক্তি, সৌন্দর্য, সমৃদ্ধি ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।

বোডি জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, যে পুরুষের পেট যত বড়, তিনি তত বেশি আকর্ষণীয় এবং সমাজে তার সম্মানও তত বেশি।

বোডি জনগোষ্ঠীর ভিন্ন সৌন্দর্য ভাবনা

দক্ষিণ ইথিওপিয়ার ওমো ভ্যালি অঞ্চলে বসবাসকারী বোডি জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বিশেষ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

তাদের সবচেয়ে আলোচিত ঐতিহ্যের একটি হলো ‘কা’ইল’ নামের একটি উৎসব। এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হলো অবিবাহিত তরুণদের মধ্যে বড় ভুঁড়ি তৈরির প্রতিযোগিতা।

প্রতি বছর পরিবারগুলো তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একজন অবিবাহিত পুরুষকে নির্বাচন করে। এরপর শুরু হয় কয়েক মাসের বিশেষ প্রস্তুতি।

ছয় মাসের ওজন বাড়ানোর কঠিন প্রস্তুতি

কা’ইল উৎসবের জন্য নির্বাচিত তরুণদের প্রায় ছয় মাস বিশেষ নিয়ম মেনে চলতে হয়। এই সময়ে তাদের সাধারণ জীবনযাপন থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন রাখা হয়।

তাদের শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলতে হয় এবং নির্দিষ্ট কুঁড়েঘরে অবস্থান করতে হয়। সমাজের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় তাদের শরীরের আকার বাড়ানোই প্রধান লক্ষ্য।

ওজন বাড়ানোর জন্য তাদের খাদ্যতালিকায় থাকে প্রচুর পরিমাণে দুধ ও গরুর রক্তের মিশ্রণ। বোডি জনগোষ্ঠীর কাছে গবাদিপশু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।

তাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী, পশু হত্যা না করে বিশেষ পদ্ধতিতে গরু থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয় এবং পরে ক্ষতস্থান বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তবে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তরল খাবার গ্রহণ করা সহজ নয়। অনেক প্রতিযোগী শারীরিক অস্বস্তির মুখোমুখি হলেও সামাজিক সম্মানের আশায় এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যান।

উৎসবের দিনে বড় ভুঁড়ির প্রদর্শনী

ছয় মাসের প্রস্তুতি শেষে কা’ইল উৎসবের দিনে প্রতিযোগীরা জনসম্মুখে আসেন।

শরীরে কাদা ও ছাই মেখে এবং মাথায় উটপাখির পালক পরে তারা নিজেদের শারীরিক গঠন প্রদর্শন করেন।

উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পবিত্র গাছকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগীদের দীর্ঘ সময় ধরে হাঁটা। প্রবীণরা তাদের শরীরের গঠন পর্যবেক্ষণ করেন।

এই সময় নারীরাও প্রতিযোগীদের সহযোগিতা করেন। তারা ঘাম মুছে দেন এবং প্রয়োজনীয় পানীয় সরবরাহ করেন।

শেষে যে প্রতিযোগীর ভুঁড়ি সবচেয়ে বড় এবং শরীরের আকৃতি সবচেয়ে বিশাল হয়, তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

বিজয়ীর পুরস্কার কী?

কা’ইল উৎসবে বিজয়ী পুরুষ কোনো অর্থ বা বস্তুগত পুরস্কার পান না।

তবে বোডি সমাজে তিনি আজীবনের জন্য বিশেষ সম্মান লাভ করেন। তাকে বীর বা নায়কের মর্যাদা দেওয়া হয়।

এ ছাড়া সামাজিকভাবে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে এবং জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তিনি বাড়তি গুরুত্ব পান।

কেন এমন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে?

বোডি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা মূলত গবাদিপশু ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তাদের সমাজে বড় শরীরকে সম্পদ, সক্ষমতা ও প্রাচুর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

যেখানে বিশ্বের অনেক সমাজে শরীরের সৌন্দর্য নির্ধারণ করা হয় চিকন বা ফিট গঠনের মাধ্যমে, সেখানে বোডিদের কাছে বড় শরীরই সফলতা ও সম্মানের পরিচায়ক।

আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যেতে পারে ঐতিহ্য

বোডি জনগোষ্ঠী নিজেদের সংস্কৃতি ও জীবনধারা ধরে রাখার জন্য পরিচিত। তবে বিশ্বের অনেক প্রাচীন সংস্কৃতির মতো তাদের ঐতিহ্যও আধুনিকতার প্রভাবে পরিবর্তনের মুখে পড়েছে।

অর্থনৈতিক পরিবর্তন, আধুনিক জীবনযাত্রা এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির কারণে কা’ইল উৎসব ও বড় ভুঁড়ির এই ঐতিহ্য ভবিষ্যতে কতটা টিকে থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তবুও বোডি জনগোষ্ঠীর এই সংস্কৃতি মনে করিয়ে দেয়—সৌন্দর্য ও মর্যাদার ধারণা পৃথিবীর সব জায়গায় এক নয়। কোনো সমাজে যে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, অন্য কোনো সংস্কৃতিতে সেটিই হতে পারে গর্ব ও পরিচয়ের প্রতীক।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page