টেস্টে ফেল করলে কি এসএসসি পরীক্ষায় বাধা দিতে পারে স্কুল?

শিক্ষা ও ক্যারিয়ার প্রতিনিধি
প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ
টেস্টে ফেল করলে কি এসএসসি পরীক্ষায় বাধা দিতে পারে স্কুল?

৩৮২ শিক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পাওয়ার পর ব্যাখ্যা চাইল ঢাকা বোর্ড

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে অংশ নেওয়া ৩৮২ শিক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পাওয়ার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।

শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ার পেছনে কোনো নিয়মবহির্ভূত কৌশল নেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে স্কুলটির কাছে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়েছে বোর্ড। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে এসব তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে।

স্কুল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য দশম শ্রেণিতে মোট ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী ছিল। তবে নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষায় ১০৩ জন অনুত্তীর্ণ হওয়ায় তাদের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। বাকি ৩৮২ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই জিপিএ-৫ অর্জন করে।

এই ফল প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, জিপিএ-৫ এর শতভাগ সাফল্য ধরে রাখতে কিছু শিক্ষার্থীকে ইচ্ছাকৃতভাবে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

১৫ বছর ধরে শতভাগ পাসের রেকর্ড

নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সাল থেকে টানা এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাসের রেকর্ড ধরে রেখেছে।

এর মধ্যে ২০১৫, ২০১৭, ২০২২ ও ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। চলতি বছরও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে এই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ গ্রেডে মোট ১৫৩ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নিজেদের প্রকাশিত ফলাফল তালিকায় প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় থাকার দাবিও করেছে।

কেন আলোচনায় স্কুলটি

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের শোকজ নোটিশের পরই মূলত প্রতিষ্ঠানটি আলোচনায় আসে। বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের জন্য নিয়মবহির্ভূত কৌশল নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক ড. মো. মাসুদ রানা খানের স্বাক্ষর করা নোটিশে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের তথ্য, নবম শ্রেণির নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর তালিকা, নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণকারী শিক্ষার্থীদের তথ্য চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

স্কুল কর্তৃপক্ষ অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. ইমন আহমেদ জানিয়েছেন, ৪৮৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৩ জন টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। নিয়ম অনুযায়ী তাদের বাদ দিয়ে ৩৮২ জনকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

তিনি দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের ফলাফল সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়েছে। একটি মহল প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বোর্ডের কাছে প্রয়োজনীয় জবাব দেওয়া হবে।

সাবেক শিক্ষার্থীদের অভিযোগ

তবে কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, টেস্ট পরীক্ষায় ভালো ফল না করার অজুহাতে অনেক শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।

তাদের একজন দাবি করেন, টেস্ট পরীক্ষায় মাত্র কয়েক নম্বর কম পাওয়ায় তাকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা দিয়ে তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

আরেক শিক্ষার্থী দাবি করেন, টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পুনরায় পরীক্ষা দিয়েও তারা ভালো ফল করেছিলেন। তবে এরপরও তাদের মূল প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভালো ফলের হার ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠানটি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জেলা প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তার বক্তব্য

এ বিষয়ে সাবেক নরসিংদী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন জানান, শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করার পর বিষয়টি যাচাই করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা সত্যিই ফেল করার মতো অবস্থায় ছিল কি না, সেটি দেখতে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যারা ভালো করেছে, তাদের বিষয়টি বিবেচনা করার অনুরোধ করা হয়েছিল।

তার মতে, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল একজন শিক্ষার্থীও যেন ফেল না করে, সে অনুযায়ী পাঠদানের ব্যবস্থা করা।

টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলে এসএসসি পরীক্ষার সুযোগ আছে কি?

শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের ক্ষেত্রে নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া অন্যতম শর্ত।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, বৈধ নিবন্ধনধারী এবং নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই এসএসসি পরীক্ষার আবেদন ফরম পূরণ করতে পারবে।

২০১৮ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক নির্দেশনায় এসএসসি ও এইচএসসি নির্বাচনী পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মূল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

তবে নির্বাচনী পরীক্ষার খাতা ও ফলাফল সংরক্ষণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও রয়েছে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করা নিয়মের অংশ। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান জিপিএ-৫ এর হার ধরে রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষার্থীদের ফেল দেখায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিনি এটিকে ‘অসুস্থ প্রতিযোগিতা’ উল্লেখ করে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিজেদের সেরা প্রমাণের প্রবণতা থেকেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এখন প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ব্যাখ্যা ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page