ওজু ছাড়া কোন কোন জিকির করা যায়?
ওজু না থাকলেও আল্লাহর স্মরণ থেমে থাকে না
অনেক মুসলমানের মধ্যেই একটি সাধারণ প্রশ্ন রয়েছে—ওজু না থাকলে কি আল্লাহর জিকির করা যাবে? কেউ ঘুম থেকে উঠে, কেউ কর্মস্থলে, কেউ ভ্রমণের সময় বা ব্যস্ততার কারণে সব সময় ওজু অবস্থায় থাকতে পারেন না। তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়েন, “আমি কি তাসবিহ পড়তে পারব? দরুদ পড়তে পারব? কোরআনের আয়াত মুখস্থ থাকলে পড়তে পারব?” ইসলামের সঠিক জ্ঞান না থাকলে মানুষ কখনো অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা অবলম্বন করে, আবার কখনো সীমা অতিক্রম করে ফেলে। তাই কোরআন, সহিহ হাদিস ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যের আলোকে বিষয়টি জানা জরুরি।
ইসলামে ওজু একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং নামাজের জন্য তা ফরজ। তবে সব ধরনের জিকিরের জন্য ওজু শর্ত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সব সময় আল্লাহকে স্মরণ করতেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, “রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করতেন।” এ হাদিস থেকে আলেমরা বলেন, সাধারণ জিকির, তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির, দরুদ ও দোয়ার জন্য ওজু আবশ্যক নয়।
ওজু ছাড়া যে জিকিরগুলো করা যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—
-
সুবহানাল্লাহ (আল্লাহ পবিত্র)
-
আলহামদুলিল্লাহ (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর)
-
আল্লাহু আকবার (আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ)
-
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই)
-
আস্তাগফিরুল্লাহ (আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই)
-
দরুদ শরিফ
-
সাধারণ দোয়া ও মুনাজাত
এসব জিকির যে কোনো সময়, যে কোনো স্থানে, ওজু ছাড়াই করা যায়। এমনকি ঘুম থেকে উঠেই মানুষ আল্লাহর প্রশংসা করতে পারে। রাসুল (সা.) ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।
দরুদ শরিফও ওজু ছাড়া পড়া যায়। যেমন—
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আালি মুহাম্মাদ।
অর্থ: হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পরিবারের ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
ইস্তিগফারও ওজু ছাড়া করা যায় এবং এটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। কোরআনে বহুবার ক্ষমা প্রার্থনার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও দিনে বহুবার ইস্তিগফার করতেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। কোরআন তিলাওয়াত ও কোরআনের জিকিরমূলক আয়াত মুখস্থ পড়া এক বিষয় নয়। অধিকাংশ আলেমের মতে, ছোট নাপাক অবস্থায় (অর্থাৎ ওজু না থাকলে) মুখস্থ কোরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ, যদিও ওজু করে পড়া উত্তম। তবে সরাসরি মুসহাফ (কোরআনের আরবি লেখা কপি) স্পর্শ করার জন্য ওজু থাকা উচিত—এ বিষয়ে অধিকাংশ ফকিহের মত রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বড় নাপাক অবস্থা (জানাবত)। এ অবস্থায় সাধারণ জিকির, তাসবিহ, দরুদ, দোয়া ও ইস্তিগফার করা যায়; তবে কোরআন তিলাওয়াত না করাই অধিকাংশ আলেমের মতে উত্তম ও নিরাপদ। তাই ওজু না থাকা আর জানাবত অবস্থাকে এক মনে করা ঠিক নয়।
অনেক মানুষ মনে করেন, ওজু ছাড়া “বিসমিল্লাহ” বলা যাবে না। এটিও ভুল ধারণা। খাওয়ার আগে, কাজ শুরুতে, যানবাহনে উঠার সময়, ঘর থেকে বের হওয়ার সময়—সব ক্ষেত্রেই ওজু ছাড়া বিসমিল্লাহ বলা যায়।
ওজু ছাড়া পড়া যায় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো—
بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহর নামে শুরু করছি, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম; আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
এই দোয়াটি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পড়া সুন্নত এবং এর জন্য ওজু শর্ত নয়।
তবে প্রশ্ন হলো, ওজু না থাকলে কি জিকিরের সওয়াব কমে যায়? আলেমরা বলেন, ওজু অবস্থায় জিকির করা অধিক পরিপূর্ণ ও উত্তম। কারণ ওজু নিজেই একটি ইবাদত এবং তা মানুষের পবিত্রতা বৃদ্ধি করে। কিন্তু ওজু না থাকার কারণে জিকির ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
আজকাল অনেকেই ব্যস্ত জীবনে ভাবেন, “ওজু নেই, পরে জিকির করব।” এভাবে করতে করতে অনেক সময় জিকিরই করা হয় না। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা হলো, জিহ্বাকে আল্লাহর স্মরণে সজীব রাখা। অল্প অল্প জিকিরও নিয়মিত করলে তা আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়।
সবশেষে বলা যায়, ওজু ছাড়া সাধারণ জিকির, তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির, দরুদ, ইস্তিগফার ও অধিকাংশ দোয়া পড়া সম্পূর্ণ জায়েজ। ওজু থাকলে তা আরও উত্তম ও বরকতময়। তাই ওজু না থাকলেও আল্লাহর স্মরণ বন্ধ করবেন না; বরং প্রতিটি অবস্থাকে জিকিরের সুযোগে পরিণত করুন।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
