বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থবছর, মন্ত্রিসভায় উঠছে প্রস্তাব
অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
দেশের প্রচলিত অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত চলা অর্থবছরকে পরিবর্তন করে এপ্রিল থেকে মার্চ করার বিষয়ে প্রস্তাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। শিগগিরই এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নির্দেশে অর্থবছর পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমানে বাজেট অনুবিভাগ অর্থবছরের সময় পরিবর্তন হলে আইন, বাজেট প্রণয়ন পদ্ধতি, কর ব্যবস্থা, সরকারি হিসাবরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন হবে, তা পর্যালোচনা করছে।
পর্যালোচনা শেষে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিগত পরিবর্তন করে আগামী অর্থবছর থেকে নতুন সময়সীমা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থবছর ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত। অর্থ আইনেও এই সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে এপ্রিল থেকে মার্চ হবে দেশের নতুন অর্থবছর।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, অর্থবছর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছর কীভাবে শেষ করা হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। আগামী বছরের এপ্রিল, মে ও জুন—এই তিন মাসে পুরোনো ও নতুন অর্থবছরের কার্যক্রম সমন্বয় করে চালানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
কেন অর্থবছর পরিবর্তনের চিন্তা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়ানো এবং অর্থ ব্যয়ের শেষ সময়ের চাপ কমাতেই অর্থবছর পরিবর্তনের চিন্তা করা হচ্ছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় অর্থবছরের শেষ তিন মাস এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত পড়ে বর্ষা মৌসুমে। এ সময়ে ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সড়ক, সেতু, পানি উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি হয়।
বিশেষ করে জুন মাসে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের চাপ তৈরি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করার প্রবণতা দেখা যায়। এতে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি অর্থ অপচয়ের অভিযোগও থাকে।
অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ করা হলে অর্থবছরের শেষ তিন মাস জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে পড়বে। এতে বর্ষার আগেই বড় ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বদলাতে হবে বাজেট ও কর ব্যবস্থাও
অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের প্রভাব শুধু উন্নয়ন প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সরকারি বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট ব্যবস্থা, সরকারি হিসাবরক্ষণ ও বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জুলাই-জুন কাঠামোর ভিত্তিতে কার্যকর হয়েছে। ফলে পুরোনো অর্থবছরের হিসাব বন্ধ করা এবং নতুন সময়সীমার সঙ্গে বাজেট সমন্বয় করা বড় একটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হবে।
এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক কর্মসম্পাদন সূচক, ক্রয় পরিকল্পনা, প্রকল্পের অর্থছাড় ও বাস্তবায়ন সময়সূচিও নতুন অর্থবছরের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
আগে উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এর আগে ২০১০ সালেও অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি।
অন্যদিকে, অর্থবছর পরিবর্তনের বিষয়ে বিভিন্ন সময় অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, অর্থবছরের সময়সীমার সঙ্গে দেশের আবহাওয়া ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থবছরের শেষ সময়ে বর্ষার কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে কাজ করতে হয়। তাই অর্থবছর এগিয়ে আনার উদ্যোগের যৌক্তিকতা রয়েছে।
তবে তিনি মনে করেন, শুধু অর্থবছরের সময় পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, অর্থছাড়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও তদারকি ব্যবস্থায়ও সংস্কার প্রয়োজন।
চ্যালেঞ্জও কম নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ করা হলে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারি হিসাব, ব্যাংকিং রিপোর্টিং, কর ব্যবস্থা, বাজেট সফটওয়্যারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন কাঠামো তৈরি করতে হবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের সময়সূচি, দরপত্র আহ্বান, কার্যাদেশ দেওয়া এবং বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আসবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শুধু তিন মাস এগিয়ে নেওয়ার বিষয় নয়; বরং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি বড় কাঠামোগত পরিবর্তন। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব দিক বিবেচনা করা হচ্ছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
