কেন কিছু দোয়া সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয় না?
দোয়া বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর রহমত কখনো বিলম্বিত হয় না
দোয়া একজন মুমিনের সবচেয়ে শক্তিশালী ইবাদতগুলোর একটি। সুখে-দুঃখে, রোগে-শোকে, অভাব-অনটনে কিংবা জীবনের কঠিন মুহূর্তে মানুষ আল্লাহর কাছেই ফিরে যায়। কিন্তু অনেকের মনে একটি প্রশ্ন বারবার আসে—আমি এত দোয়া করি, তারপরও কেন দোয়া সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয় না? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিষয়টি বুঝতে হবে।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেছেন, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” (সুরা গাফির: ৬০)। এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে আল্লাহ বান্দার দোয়া শুনেন। তবে দোয়ার জবাব সব সময় আমাদের চাওয়া সময়ে বা চাওয়া পদ্ধতিতে নাও আসতে পারে। ইসলামের শিক্ষা হলো, দোয়া কখনোই বৃথা যায় না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকের দোয়া কবুল হয়, যতক্ষণ সে তাড়াহুড়া না করে। সে বলে না—আমি দোয়া করেছি, কিন্তু কবুল হতে দেখিনি।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। অর্থাৎ দোয়া করার পর হতাশ হয়ে যাওয়া বা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া একজন মুমিনের জন্য উচিত নয়।
অনেক সময় মানুষ এমন কিছু চায় যা তার কাছে ভালো মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে তা তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা এমন কিছুকে পছন্দ কর, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর হতে পারে; আর এমন কিছুকে অপছন্দ কর, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হতে পারে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।” (সুরা বাকারা: ২১৬)। তাই কোনো দোয়া বিলম্বিত হওয়া মানেই তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
সহিহ হাদিসে এসেছে, কোনো মুসলিম এমন দোয়া করলে যাতে গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় না থাকে, আল্লাহ তার দোয়ার ব্যাপারে তিনটির একটি করেন: হয় তা দ্রুত কবুল করেন, অথবা আখিরাতের জন্য সওয়াব হিসেবে জমা রাখেন, অথবা সমপরিমাণ কোনো বিপদ দূর করে দেন। (মুসনাদ আহমদ)। এই হাদিস মুমিনকে আশ্বস্ত করে যে দোয়ার উপকার অবশ্যই আছে, যদিও আমরা সব সময় তা বুঝতে পারি না।
দোয়া কবুল না হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে হারাম উপার্জন ও গুনাহপূর্ণ জীবন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, যে দীর্ঘ সফরে, অগোছালো অবস্থায় হাত তুলে আল্লাহকে ডাকছে, কিন্তু তার খাদ্য, পানীয় ও উপার্জন হারাম। এরপর তিনি বলেন, “তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?” (সহিহ মুসলিম)। তাই হালাল উপার্জন, অন্যের হক আদায়, তাওবা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা দোয়া কবুলের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
দোয়ার আদবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করা, দরুদ পড়া, বিনয়ের সঙ্গে চাওয়া এবং বারবার দোয়া করা সুন্নত। এ সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ وَرَحْمَتِكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা মিন ফাদলিকা ওয়া রহমাতিক।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার অনুগ্রহ ও রহমত প্রার্থনা করছি।
এই দোয়ায় বান্দা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের আশ্রয় চায়, যা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের মূল উৎস।
অনেক সময় আল্লাহ বান্দার দোয়া বিলম্বিত করেন তার ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা বৃদ্ধি করার জন্য। নবীদের জীবনেও আমরা এর উদাহরণ দেখি। হযরত জাকারিয়া (আ.) দীর্ঘ সময় সন্তান চেয়েছেন, হযরত ইয়াকুব (আ.) বহু বছর ইউসুফ (আ.)-এর বিচ্ছেদ সহ্য করেছেন। তাই বিলম্ব সব সময় অকল্যাণের লক্ষণ নয়।
দোয়া কবুলের বিশেষ সময়গুলোর মধ্যে রয়েছে তাহাজ্জুদের শেষ অংশ, সিজদার সময়, আযান ও ইকামতের মাঝখানে, ফরজ নামাজের পর, জুমার দিনের বিশেষ সময় এবং ইফতারের মুহূর্ত। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হৃদয়ের উপস্থিতি ও আন্তরিকতা।
অনেক মানুষ শুধু বিপদে পড়লে দোয়া করেন, কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে আল্লাহকে ভুলে যান। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিখিয়েছেন, সুখের সময় আল্লাহকে স্মরণ করলে কঠিন সময়ে আল্লাহর সাহায্য পাওয়া যায়। তাই দোয়া শুধু চাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার উপায়।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, দোয়া কখনোই হারিয়ে যায় না। হয় আল্লাহ তাৎক্ষণিকভাবে দেন, নয়তো আরও ভালো কিছু দেন, অথবা বিপদ দূর করেন, অথবা আখিরাতের জন্য সওয়াব জমা রাখেন। একজন মুমিনের কাজ হলো—দোয়া করা, হালাল পথে থাকা, তাওবা করা, ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা।
হয়তো যে দোয়ার উত্তর আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি না, তার রহমত আমরা আগামীকাল বুঝব। আর কিছু দোয়ার প্রতিদান মানুষ আখিরাতে দেখে এমন আনন্দিত হবে যে সে চাইবে, দুনিয়াতে যদি তার কোনো দোয়াই সঙ্গে সঙ্গে কবুল না হতো। এটাই মুমিনের আশা, ভরসা ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার শিক্ষা।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
