কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন, হাসিনার পতনের আগের ৭২ ঘণ্টায় কী ঘটেছিল?

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৮ অপরাহ্ণ
কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন, হাসিনার পতনের আগের ৭২ ঘণ্টায় কী ঘটেছিল?

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে এক দফা দাবি এবং ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন যে শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবর্তনের এক দফা দাবিতে রূপ নেবে, ২০২৪ সালের আগস্টের শুরুতে তা অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত। তবে কয়েক দিনের ব্যবধানেই পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করে। এরপর ৫ আগস্টের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ওই সমাবেশে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারকে শুধু পদত্যাগ করলেই হবে না, আন্দোলনে নিহতদের ঘটনার বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জানান, আন্দোলনকারীরা কোনো আপসের মাধ্যমে সরকারকে বিদায়ের সুযোগ দিতে চান না।

ওই সমাবেশ থেকেই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। প্রথমে ৬ আগস্ট কর্মসূচির তারিখ নির্ধারণ করা হলেও পরে তা একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট করা হয়।

শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট কারফিউয়ের মধ্যেও রাজধানীর রাজপথে বিপুলসংখ্যক মানুষ নেমে আসে। দুপুরের দিকে শেখ হাসিনা সামরিক বাহিনীর একটি উড়োজাহাজে করে ভারতের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন।

এর কয়েক ঘণ্টা পর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে বক্তব্যে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

আন্দোলনের সূচনা থেকে উত্তাল পরিস্থিতি

কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন নতুন মাত্রা পায় ১৬ জুলাই। ওই দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ে।

১৬ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত সহিংসতার ঘটনা তদন্তে তৎকালীন সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। জুলাইয়ের শেষ দিকে আন্দোলন রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

আগস্টের শুরুতে এসে আন্দোলনকারীরা সরকারবিরোধী কর্মসূচি আরও জোরদার করেন।

২ আগস্ট: গণমিছিল ও আন্দোলনের নতুন মোড়

২ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে দেশজুড়ে গণমিছিল কর্মসূচি পালিত হয়। ওই দিন ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাজারো মানুষ জড়ো হন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে অংশ নেন।

সেদিন আন্দোলনের সমন্বয়করা অভিযোগ করেন, তাদের কয়েকজনকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে কর্মসূচি প্রত্যাহারের বিষয়ে চাপ দেওয়া হয়েছিল।

একই দিনে আন্দোলনকারীরা ৩ আগস্ট বিক্ষোভ এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন।

এদিকে শিক্ষক, অভিভাবক, সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের অংশগ্রহণে রাজধানীতে ‘দ্রোহ যাত্রা’ কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়।

৩ আগস্ট: এক দফা দাবির ঘোষণা

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করে।

আন্দোলনকারীরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকার গঠনের দাবিও জানান।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভবনের দরজা খোলা রয়েছে। তবে আন্দোলনের সমন্বয়করা সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।

নাহিদ ইসলাম জানান, সরকারের সঙ্গে আলোচনার সময় শেষ হয়ে গেছে এবং বিচার ও জবাবদিহির দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

সেদিন রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা শহরেও বড় ধরনের বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়।

একই সঙ্গে ৪ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

৪ আগস্ট: সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও উত্তেজনা

অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।

সেদিন মোবাইল ইন্টারনেট সেবায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। বিভিন্ন স্থানে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

সিরাজগঞ্জে সংঘর্ষে অন্তত ১৮ জন নিহত হন বলে জানা যায়, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ছিলেন।

এ পরিস্থিতিতে সাবেক সেনাপ্রধানসহ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা সশস্ত্র বাহিনীকে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি না করার আহ্বান জানান।

সন্ধ্যার পর সরকার বিভিন্ন এলাকায় সান্ধ্য আইন জারি করে।

এদিনই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট পালনের ঘোষণা দেয়।

৫ আগস্ট: ক্ষমতার পালাবদল

৫ আগস্ট সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কারফিউ উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ ঢাকার দিকে এগিয়ে আসেন।

বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকলেও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বড় ধরনের বাধার ঘটনা ঘটেনি।

একপর্যায়ে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে জানা যায়, তিনি সামরিক বাহিনীর একটি উড়োজাহাজে করে ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।

দুপুরের পর সেনাপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি ও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

এরপর রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় মানুষের ঢল নামে। গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদ ভবন এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রবেশ করে।

একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক স্থাপনা, সরকারি স্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

রাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে জানান, দ্রুত অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে এবং সংসদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় সরকারি হিসাবে ৮০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্টের ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page