দেনমোহর কি সামাজিক মর্যাদার প্রতীক? ইসলাম কী বলে
ইসলামে দেনমোহর নারীর অধিকার, সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের উপায় নয়।
বিয়ের কাবিননামায় অনেক সময় দেনমোহরের ঘরে লেখা হয় কয়েক লাখ, এমনকি কোটি টাকার অঙ্ক। কিন্তু বাস্তবে সেই অর্থ পরিশোধের ঘটনা খুবই কম। অনেক ক্ষেত্রে এটি শুধু সামাজিক মর্যাদা বা পারিবারিক অবস্থান প্রদর্শনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইসলামে দেনমোহরের উদ্দেশ্য কখনোই সামাজিক প্রতিযোগিতা নয়; বরং এটি স্ত্রীর একটি নিশ্চিত আর্থিক অধিকার।
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, দেনমোহর (মোহরানা) হলো বিয়ের সময় স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে দেওয়া বাধ্যতামূলক আর্থিক উপহার। এটি স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদ এবং এর ওপর অন্য কারও অধিকার নেই।
দেনমোহর সম্পর্কে কোরআনের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
“তোমরা নারীদের তাদের দেনমোহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো।”
(সুরা আন-নিসা, আয়াত: ৪)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, দেনমোহর শুধু কাগজে-কলমে উল্লেখ করার বিষয় নয়; বরং তা আন্তরিকভাবে পরিশোধ করা স্বামীর দায়িত্ব।
কত হওয়া উচিত দেনমোহর?
ইসলাম দেনমোহরের নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক নির্ধারণ করেনি। বরং স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী বাস্তবে পরিশোধযোগ্য দেনমোহর নির্ধারণ করার নির্দেশনা দিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে হলো যে বিয়ে সবচেয়ে সহজ।”
(মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৪৫২৯)
অন্য একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে দেখা যায়, এক দরিদ্র সাহাবির কাছে দেনমোহর দেওয়ার মতো কিছু না থাকলে নবী (সা.) প্রথমে একটি লোহার আংটি খুঁজতে বলেন। সেটিও না পেলে, তাঁর জানা কোরআনের শিক্ষা স্ত্রীকে শেখানোর বিনিময়কেই দেনমোহর হিসেবে গ্রহণ করেন।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১২১)
এ থেকেই বোঝা যায়, ইসলামে দেনমোহরের মূল বিষয় অঙ্ক নয়; বরং আন্তরিকতা ও বাস্তবতা।
কেন বাড়ছে অবাস্তব দেনমোহর?
সমাজে বর্তমানে অনেক পরিবার দেনমোহরের অঙ্ককে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে কাবিননামায় এমন অঙ্ক লেখা হয়, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিশোধ করার বাস্তব সামর্থ্য থাকে না।
এতে কয়েকটি সমস্যা তৈরি হয়—
১. বিয়ের শুরুতেই একটি অবাস্তব প্রতিশ্রুতি তৈরি হয়।
২. স্বামীর ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়।
৩. দাম্পত্য জীবনে বিরোধ দেখা দিলে দেনমোহর অনেক সময় আইনি চাপের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
৪. পারস্পরিক বিশ্বাসের পরিবর্তে সম্পর্কে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
পরিশোধের নিয়ত না থাকলে কী হবে?
ইসলামে প্রতিশ্রুতি রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেনমোহর পরিশোধের ইচ্ছা ছাড়াই শুধু আনুষ্ঠানিকতার জন্য বড় অঙ্ক লিখে রাখা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এক বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি দেনমোহর পরিশোধের নিয়ত ছাড়া বিয়ে করে, সে আল্লাহর কাছে প্রতারণাকারী হিসেবে গণ্য হবে।
(মুসনাদে আহমাদ)
যদিও এ বর্ণনার সনদ নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, তবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণ না করা যে অসততার অন্তর্ভুক্ত—এ বিষয়ে ইসলামী স্কলারদের মধ্যে মতভেদ নেই।
ইসলামের দৃষ্টিতে উত্তম পন্থা
ইসলামের শিক্ষা হলো, এমন দেনমোহর নির্ধারণ করা উচিত—
১. যা স্বামীর সামর্থ্যের মধ্যে থাকে।
২. বাস্তবে পরিশোধ করা সম্ভব হয়।
৩. স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
৪. সামাজিক প্রতিযোগিতার অংশ না হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।”
(সুরা আর-রূম, আয়াত: ২১)
দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হওয়া উচিত ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাস—অবাস্তব আর্থিক প্রতিশ্রুতি নয়।
দেনমোহর ইসলামে নারীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। তবে এর উদ্দেশ্য কখনোই সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন বা লোক দেখানো নয়। বাস্তবসম্মত, পরিশোধযোগ্য এবং আন্তরিকভাবে নির্ধারিত দেনমোহরই ইসলামের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কাগজে বিশাল অঙ্ক লিখে তা পরিশোধের কোনো ইচ্ছা না রাখা দাম্পত্য জীবনের শুরুতেই আস্থার ঘাটতি তৈরি করতে পারে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
