মুত’আ বিয়ে নিয়ে বিভ্রান্তি, কোরআন-হাদিস কী বলছে
মুত'আ বিয়ে নিয়ে বিভ্রান্তি, কোরআন-হাদিস কী বলছে
মুতা বিয়ে কী এবং ইসলামে এর বিধান কী?
বর্তমান সময়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন আলোচনা এবং ধর্মীয় বিতর্কে ‘মুতা বিয়ে’ বিষয়টি প্রায়ই আলোচনায় আসে। অনেকেই জানতে চান, মুতা বিয়ে আসলে কী, ইসলামে এর অবস্থান কী এবং এটি বৈধ না অবৈধ। বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের ইতিহাস, হাদিস এবং ফিকহের আলোকে এর পটভূমি জানা প্রয়োজন।
মুতা বিয়ে কী?
মুতা বিয়ে বা অস্থায়ী বিয়ে হলো এমন এক ধরনের বৈবাহিক চুক্তি, যেখানে একজন পুরুষ ও একজন নারী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরস্পরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্কও শেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ এটি স্থায়ী সংসার গঠন, পরিবার প্রতিষ্ঠা বা বংশবিস্তারের উদ্দেশ্যে নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পারস্পরিক চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক।
ইসলাম-পূর্ব জাহেলি যুগে আরব সমাজে এ ধরনের বিয়ের প্রচলন ছিল। সে সময় সমাজে নানা ধরনের অনিয়ন্ত্রিত সম্পর্ক ও প্রথা চালু ছিল। ইসলাম আগমনের পর এসব বিষয়ে ধীরে ধীরে সংস্কার আনা হয়।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে কেন অনুমতি দেওয়া হয়েছিল?
ইসলামের শুরুতে মুসলমানদের অনেক সময় দীর্ঘ সফর, যুদ্ধ এবং সামরিক অভিযানে অংশ নিতে হতো। মাসের পর মাস স্ত্রী ও পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে অনেকের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠত। সেই বিশেষ বাস্তবতায় কিছু সময়ের জন্য মুতা বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ড. ইউসুফ আল-কারযাভী (রহ.) উল্লেখ করেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগ ছিল জাহেলি সমাজ থেকে ইসলামী সমাজে উত্তরণের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময়। সে সময় ব্যভিচার ছিল ব্যাপকভাবে প্রচলিত। নতুন মুসলমানদের মধ্যে অনেকের ঈমান দৃঢ় ছিল, আবার অনেকে ছিল দুর্বল। দুর্বল ঈমানের লোকদের ব্যভিচারে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল।
এ অবস্থায় ব্যভিচারের মতো বড় গুনাহ থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য সাময়িকভাবে মুতা বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
সাহাবিদের ঘটনা
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন—
“আমরা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতাম এবং আমাদের সঙ্গে কোনো নারী থাকত না। তখন আমরা বললাম, আমরা কি নিজেদের খাসি করে নেব? রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের তা করতে নিষেধ করলেন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নারীদের সঙ্গে বিয়ে করার অনুমতি দিলেন।”
এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এটি ছিল বিশেষ পরিস্থিতিতে দেওয়া একটি সাময়িক ছাড়, স্থায়ী বিধান নয়।
ইসলামে বিয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য
ইসলামে বিয়ে কেবল শারীরিক সম্পর্কের বিষয় নয়। এটি একটি পবিত্র, স্থায়ী এবং দায়িত্বপূর্ণ বন্ধন। বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, দয়া, পারিবারিক স্থিতি এবং বংশবিস্তার নিশ্চিত হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আর আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জোড়া থেকে তোমাদের জন্য পুত্র ও নাতিদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের উত্তম রিজিক দান করেছেন।”
(সুরা নাহল: ৭২)
মুতা বিয়েতে এই দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক লক্ষ্য পূরণ হয় না। তাই ইসলামি শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ ধরনের বিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়।
মুতা বিয়ে কখন হারাম করা হয়?
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরবর্তীকালে মুতা বিয়েকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে দেন।
হজরত সাবরা আল-জুহানী (রা.) বর্ণনা করেন—
“মক্কা বিজয়ের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের মুতা বিয়ের অনুমতি দিয়েছিলেন। পরে মক্কা থেকে বের হওয়ার আগেই তিনি তা নিষিদ্ধ করে দেন।”
(সহিহ মুসলিম)
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত এটিকে হারাম করে দিয়েছেন।”
এই হাদিস থেকে অধিকাংশ আলেম একমত হয়েছেন যে মুতা বিয়ের অনুমতি পরবর্তীকালে বাতিল হয়ে যায় এবং এটি স্থায়ীভাবে হারাম ঘোষিত হয়।
সাহাবিদের অবস্থান কী ছিল?
হজরত আলী (রা.)-সহ অধিকাংশ সাহাবি মুতা বিয়েকে হারাম বলে মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ নির্দেশনাই চূড়ান্ত বিধান এবং সেই নির্দেশনা অনুযায়ী মুতা বিয়ে আর বৈধ নয়।
তবে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) প্রথম দিকে বিশেষ জরুরি অবস্থায় এর অনুমতি থাকার মত প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু পরে যখন তিনি দেখলেন, মানুষ এ ফতোয়ার অপব্যবহার করছে, তখন তিনি সেই মত থেকে সরে আসেন।
ফলে সাহাবিদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত মুতা বিয়ের বৈধতার পক্ষে কোনো কার্যকর মত অবশিষ্ট থাকেনি।
বর্তমান ইসলামী আইন কী বলে?
চার মাযহাবের (হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি) আলেমরা একমত যে মুতা বিয়ে বর্তমানে বৈধ নয়।
তাদের মতে, এটি ইসলামের স্থায়ী বিবাহব্যবস্থার উদ্দেশ্য ও কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ ইসলামি বিয়ে হলো আজীবন সম্পর্ক, পারিবারিক স্থিতি, দায়িত্ববোধ এবং বংশধারা রক্ষার একটি মাধ্যম।
অন্যদিকে মুতা বিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক সম্পর্ক, যা ইসলামী বিবাহের মৌলিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ বিয়ের গুরুত্ব
ইসলাম মানুষকে পবিত্র জীবনযাপন, বৈধ সম্পর্ক এবং দায়িত্বশীল পারিবারিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার শিক্ষা দেয়। বিয়ে কেবল ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম নয়; বরং এটি সমাজ ও পরিবারের ভিত্তি।
এ কারণে ইসলাম স্থায়ী বিবাহকে উৎসাহিত করেছে এবং এমন সব পদ্ধতি নিষিদ্ধ করেছে, যা পারিবারিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
মুতা বিয়ে জাহেলি যুগে প্রচলিত একটি প্রথা ছিল। ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিশেষ পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে এর অনুমতি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটিকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। অধিকাংশ সাহাবি, তাবেয়ি এবং চার মাযহাবের আলেমদের সর্বসম্মত মত হলো, বর্তমান সময়ে মুতা বিয়ে বৈধ নয়।
ইসলামে বৈধ বিবাহ হলো এমন একটি স্থায়ী ও দায়িত্বপূর্ণ বন্ধন, যা পারিবারিক শান্তি, ভালোবাসা, বংশবিস্তার এবং সমাজের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। তাই একজন মুসলমানের জন্য শরিয়তসম্মত স্থায়ী বিবাহই অনুসরণীয় পথ।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

আপনার মতামত লিখুন
Array