স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন বিনোদনের বিস্তারের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। প্রযুক্তি বর্তমান বিশ্বের অপরিহার্য অংশ হলেও এর অতিরিক্ত ব্যবহার এখন নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীন ইন্টারনেট ব্যবহার শুধু সময় নষ্টই করছে না, বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সম্প্রতি আঁচল ফাউন্ডেশন পরিচালিত ‘শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রভাব: সতর্ক হওয়া জরুরি’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ১ হাজার ৭৭৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বড় একটি অংশ জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে তারা মানসিক চাপ, বিষণ্নতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।
আরও পড়ুন- শিক্ষায় ইন্টারনেটের বিপ্লব, যেভাবে বদলে দিয়েছে শেখার পুরো পদ্ধতি
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ নারী, ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ এবং ০ দশমিক ৮ শতাংশ তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী ছিলেন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অবসর সময় কাটানোর জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এছাড়া ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ যোগাযোগের জন্য, ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ অনলাইন গেম বা ভিডিও দেখার জন্য এবং ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ পড়াশোনার কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।
উদ্বেগের বিষয় হলো, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রতিদিন দীর্ঘ সময় অনলাইনে কাটাচ্ছেন। জরিপে দেখা গেছে, ৬ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী দিনে ১১ ঘণ্টার বেশি সময় ইন্টারনেটে থাকেন। অন্যদিকে প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা অনলাইনে কাটান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহার ধীরে ধীরে এক ধরনের মানসিক নির্ভরতায় পরিণত হতে পারে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ কমে যায়, পড়াশোনায় আগ্রহ হ্রাস পায় এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলো দুর্বল হতে শুরু করে।
সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ৭২ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ মনে করেন, তাদের মানসিক সমস্যার সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
এছাড়া ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, ইন্টারনেট তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রায় ৬০ শতাংশ মনে করেন, অতিরিক্ত অনলাইন সময় তাদের পড়াশোনার ক্ষতি করছে। অন্যদিকে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী বিষণ্নতা বা মানসিক চাপ অনুভব করেছেন এবং ২০ দশমিক ৩ শতাংশ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইন্টারনেট আসক্তি মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা ধীরে ধীরে নির্ভরতা তৈরি করে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা আরও বেশি সময় অনলাইনে কাটাতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অনেক ক্ষেত্রে এটি গেমিং আসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভরতা কিংবা অনলাইন জুয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণেও রূপ নিতে পারে।
শুধু মানসিক নয়, শারীরিক সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে ঘাড় ও পিঠে ব্যথা, চোখের সমস্যা, অনিদ্রা, মাথাব্যথা এবং শারীরিক দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করা নয়, বরং সঠিকভাবে ব্যবহার শেখানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খেলাধুলা, বই পড়া, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট ছাড়া চলা সম্ভব নয়। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার যাতে আসক্তিতে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: আঁচল ফাউন্ডেশনের সমীক্ষা প্রতিবেদন ও মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের মতামত।
আরও পড়ুন- শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের বিস্ময়কর প্রভাব, বদলে যাচ্ছে শেখানো ও শেখার পুরো পদ্ধতি









