দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সম্ভাব্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য হারে বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যয় কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, শিক্ষা খাত বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে আসন্ন বাজেটে। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ বৃদ্ধির হার অন্যান্য অনেক খাতের তুলনায় বেশি রাখা হচ্ছে। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেও এ খাতগুলোতে বাড়তি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন- শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের বিস্ময়কর প্রভাব, বদলে যাচ্ছে শেখানো ও শেখার পুরো পদ্ধতি
প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৪৭ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে এ খাতে কয়েক হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বিনিয়োগ যুক্ত হবে।
অন্যদিকে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দে। চলতি অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও নতুন বাজেটে তা বেড়ে ৪২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে। এতে প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুধু পরিচালন ব্যয় নয়, উন্নয়ন বাজেটেও প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুযায়ী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ ১১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকায় নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ এ খাতে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় জিডিপির তুলনায় তুলনামূলক কম ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের সঙ্গে তুলনা করলে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে নতুন বাজেটে এসব খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু বাজেটের অঙ্ক বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না। বরং বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার মান ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যে এখনও বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। তাই বাড়তি বরাদ্দ যেন প্রকৃত প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয় এবং শিক্ষার্থীরা তার সুফল পায়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
তারা আরও মনে করেন, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, দক্ষ শিক্ষক তৈরি এবং আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহের মাধ্যমে এই বরাদ্দের প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব। অন্যথায় শুধু বাজেট বৃদ্ধি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।
সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন অপেক্ষা চূড়ান্ত বাজেট ঘোষণার, যেখানে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন কতটা অগ্রাধিকার পায়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
| খাত | চলতি বরাদ্দ | প্রস্তাবিত বরাদ্দ |
|---|---|---|
| মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ | ৪৭,৫৬৪ কোটি টাকা | ৫০,৩০২ কোটি টাকা |
| প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় | ৩৫,৪০৩ কোটি টাকা | ৪২,১৪৫ কোটি টাকা |
| প্রাথমিক শিক্ষার এডিপি বরাদ্দ | ১১,৩৯৮ কোটি টাকা | ১৬,৪৮৪ কোটি টাকা |
সূত্র: অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র, প্রস্তাবিত বাজেট প্রাক্কলন।
আরও পড়ুন- শিক্ষায় ইন্টারনেটের বিপ্লব, যেভাবে বদলে দিয়েছে শেখার পুরো পদ্ধতি







