বিশ্বের প্রথম মোবাইল ব্যাংকিং চালু হয় কোন দেশে? জানুন ইতিহাস
কেনিয়ার এম-পেসা বিশ্বে সফল মোবাইল ব্যাংকিং সেবার পথিকৃৎ।
ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় আর্থিক সেবাগুলোর একটি। ঘরে বসেই টাকা পাঠানো, অর্থ গ্রহণ, বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সেবা এখন মুহূর্তেই সম্পন্ন করা যায় একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। তবে আজকের এই আধুনিক সেবার সূচনা কোথায় এবং বিশ্বের প্রথম মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবা চালু করে কোন দেশ—এ প্রশ্নের উত্তর অনেকেরই অজানা। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক মোবাইল মানি বা মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবার সফল বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয় কেনিয়ায়, যেখানে ২০০৭ সালে এম-পেসা (M-Pesa) চালু হওয়ার মাধ্যমে মোবাইল আর্থিক সেবায় এক নতুন যুগের সূচনা হয়।
যদিও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ধারণা ১৯৯০-এর দশকের শেষদিকে ইউরোপে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছিল, তবে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ, নিরাপদ এবং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত মোবাইল আর্থিক সেবার সফল বাস্তবায়ন প্রথম দেখা যায় কেনিয়ায়। ২০০৭ সালে মোবাইল অপারেটর সাফারিকম (Safaricom) এবং ভোডাফোন (Vodafone) যৌথভাবে M-Pesa চালু করে। শুরুতে এটি ক্ষুদ্র ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য তৈরি হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি অর্থ পাঠানো, অর্থ গ্রহণ এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে ওঠে।
কেনিয়ায় এম-পেসা চালুর অন্যতম কারণ ছিল দেশটির বড় একটি জনগোষ্ঠীর ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা। গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে ব্যাংকের শাখা ছিল সীমিত, ফলে অর্থ লেনদেন করতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগত। এম-পেসা সেই সমস্যার সহজ সমাধান নিয়ে আসে। একটি সাধারণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই মানুষ নিরাপদে টাকা পাঠাতে ও গ্রহণ করতে পারে। ফলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়াই লাখো মানুষ প্রথমবারের মতো ডিজিটাল আর্থিক সেবার আওতায় আসে। এই উদ্যোগ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী একটি সফল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
তবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ইতিহাস আরও কিছুটা পুরোনো। ১৯৯৭ সালে ফিনল্যান্ডের Merita Bank বিশ্বের প্রথম দিকের মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা চালু করে, যেখানে গ্রাহকরা মোবাইলের মাধ্যমে সীমিত কিছু ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারতেন। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে ইউরোপের বিভিন্ন ব্যাংক WAP (Wireless Application Protocol) প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকদের মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা দিতে শুরু করে। কিন্তু তখনকার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং স্মার্টফোনের অভাবে এই সেবা খুব বেশি জনপ্রিয় হতে পারেনি।
২০০০ সালের পর মোবাইল প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিংও নতুন গতি পায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ধীরে ধীরে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারিত হয়। তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনে মোবাইলকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে কেনিয়ার এম-পেসা সবচেয়ে সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশ এই মডেল অনুসরণ করে নিজস্ব মোবাইল আর্থিক সেবা চালু করেছে।
বাংলাদেশেও মোবাইল ব্যাংকিং খাত দ্রুত বিকাশ লাভ করেছে। ২০১১ সালের ৩১ মার্চ ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি দেশের প্রথম মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে, যা বর্তমানে রকেট (Rocket) নামে পরিচিত। একই বছর বিকাশ (bKash) যাত্রা শুরু করে এবং পরবর্তীতে **নগদ (Nagad), উপায় (Upay), শিওরক্যাশ (SureCash)**সহ আরও কয়েকটি মোবাইল আর্থিক সেবা চালু হয়। বর্তমানে দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে টাকা লেনদেন, বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ, সরকারি ভাতা গ্রহণ, অনলাইন কেনাকাটা এবং অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন।
বর্তমান বিশ্বে মোবাইল ব্যাংকিং শুধু অর্থ লেনদেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখন এই সেবার মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, ট্রেন ও বিমান টিকিট কেনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি জমা, কর পরিশোধ, আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স গ্রহণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের সুযোগও তৈরি হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেনিয়ায় এম-পেসা চালুর মাধ্যমে বিশ্বের আর্থিক প্রযুক্তি খাতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়। বর্তমানে আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ একই ধরনের মোবাইল আর্থিক সেবা চালু করে সফলতা অর্জন করেছে। ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে মোবাইল ব্যাংকিং এখন একটি অপরিহার্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিশ্বের প্রথম সফল ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবা চালু হয় কেনিয়ায়, যেখানে ২০০৭ সালে এম-পেসা চালুর মাধ্যমে ডিজিটাল আর্থিক সেবার নতুন যুগের সূচনা হয়। যদিও এর আগে ইউরোপে সীমিত আকারে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার শুরু হয়েছিল, তবুও সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য, কার্যকর এবং জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবার বাস্তব রূপ প্রথম সফলভাবে দেখা যায় কেনিয়াতেই। আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোবাইল ব্যাংকিং সেবার পেছনে এম-পেসার এই সফল যাত্রাকে অন্যতম অনুপ্রেরণা হিসেবে ধরা হয়।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
