সরকারি সেবা নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরে বেড়ানো কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য দালালের দ্বারস্থ হওয়া—বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো দীর্ঘদিনের পরিচিত বাস্তবতা। তবে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগোতে গিয়ে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন মাত্র কয়েকটি ক্লিকেই মিলছে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সরকারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘myGov’।
আরও পড়ুন-myGov অ্যাকাউন্ট তৈরি ও ভেরিফাই করার নতুন নিয়ম জানুন
বাংলাদেশ সরকারের অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট (a2i) উদ্যোগে তৈরি myGov অ্যাপ বর্তমানে নাগরিকদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল গেটওয়ে হিসেবে কাজ করছে। যেখানে দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি দপ্তরের সেবা এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হয়েছে। ফলে নাগরিকদের আলাদা আলাদা ওয়েবসাইট বা অফিসে না গিয়েও অনলাইনে অনেক সরকারি সেবা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, myGov অ্যাপের মূল লক্ষ্য হলো নাগরিক সেবাকে সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা। বর্তমানে জন্ম নিবন্ধন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, পাসপোর্ট, চাকরি এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা ধাপে ধাপে এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়েছে। এতে সময় ও খরচ দুটোই কমছে সাধারণ মানুষের।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল সরকারি সেবার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নাগরিকদের ভোগান্তি কমে যাওয়া। আগে একটি আবেদন জমা দিতে কিংবা কোনো তথ্য জানতে সরাসরি সরকারি অফিসে যেতে হতো। এখন ঘরে বসেই মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে এসব কাজ করা সম্ভব হচ্ছে।
myGov অ্যাপের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এক প্ল্যাটফর্মে একাধিক সরকারি সেবা পাওয়া। ব্যবহারকারীরা নাগরিক সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, পাসপোর্ট, চাকরি ও বিভিন্ন অনলাইন আবেদন সংক্রান্ত তথ্য এক জায়গা থেকেই দেখতে পারেন। ফলে আলাদা আলাদা সাইট খুঁজে সময় নষ্ট করতে হয় না।
শিক্ষার্থীদের জন্যও অ্যাপটি বেশ কার্যকর হয়ে উঠছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্য, উপবৃত্তি ও স্কলারশিপ সংক্রান্ত তথ্য, অনলাইন আবেদন এবং সরকারি নোটিশ এখন সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এতে বেশি উপকৃত হচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য খাতেও myGov অ্যাপের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালের তথ্য, স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনা এবং জরুরি স্বাস্থ্য সেবা সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারছেন।
ভূমি সংক্রান্ত তথ্য ও সেবাও এখন ডিজিটালভাবে পাওয়া যাচ্ছে এই প্ল্যাটফর্মে। খতিয়ান, নামজারি, ভূমি রেকর্ড ও বিভিন্ন নির্দেশিকা সম্পর্কিত তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলে ভূমি সেবা নিতে আগের তুলনায় ঝামেলা কমছে।
পাসপোর্ট ও বিদেশ ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্যও myGov অ্যাপের মাধ্যমে সহজে পাওয়া যাচ্ছে। ই-পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ভিসা অন অ্যারাইভাল সংক্রান্ত তথ্য এখন নাগরিকরা ঘরে বসেই জানতে পারছেন।
চাকরি প্রার্থীদের জন্যও রয়েছে সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি ও আবেদন সংক্রান্ত তথ্য। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক সেবাও যুক্ত করা হয়েছে প্ল্যাটফর্মটিতে।
myGov অ্যাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভিযোগ ও মতামত দেওয়ার সুযোগ। কোনো সরকারি সেবা নিয়ে সমস্যা হলে নাগরিকরা সরাসরি অভিযোগ দাখিল করতে পারেন। এতে সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। myGov অ্যাপ সরকারি সার্ভারে পরিচালিত হওয়ায় ব্যবহারকারীদের তথ্য সুরক্ষায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
অ্যাপটি ব্যবহার করাও তুলনামূলক সহজ। বাংলা ভাষাভিত্তিক ইন্টারফেস থাকায় সব বয়সের মানুষ সহজেই এটি ব্যবহার করতে পারছেন। প্লে স্টোর থেকে বিনামূল্যে অ্যাপটি ডাউনলোড করে রেজিস্ট্রেশন করলেই সেবা নেওয়া সম্ভব।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভবিষ্যতে আরও নতুন সেবা myGov প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো ধীরে ধীরে অধিকাংশ সরকারি সেবা এক জায়গায় নিয়ে আসা, যাতে নাগরিকরা সহজে ও দ্রুত সেবা পান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে ডিজিটাল সরকারি সেবার বিকল্প নেই। আর myGov সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে উঠছে। সময় বাঁচানো, খরচ কমানো এবং স্বচ্ছ সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করছে।
সূত্র: myGov প্ল্যাটফর্ম, a2i এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য।
আরও পড়ুন-শিক্ষার্থীদের জন্য myGov এ মিলছে এক প্ল্যাটফর্মে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা










