যেভাবে শেষ হলো মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়, বিদায়েও রেখে গেলেন নিজের ছাপ
বেনিনকে ৩–০ গোলে হারিয়ে মাঠ ছাড়ল আর্জেন্টিনা
বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে যেন একসঙ্গে লেখা হলো গৌরব আর বিদায়ের গল্প। বেনিনের বিপক্ষে ৩–০ গোলের জয়ে আর্জেন্টিনা শেষ করল বিশেষ এই ম্যাচ, আর জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নেমে নিজের ছাপ রেখে গেলেন লিওনেল মেসি। ম্যাচের ফলের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল মেসির বিদায়ের মুহূর্ত। ৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের উপস্থিতিতে পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে ছিল আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতির আবহ। ম্যাচের আগে বিশাল ১০ নম্বর জার্সি ও ‘Gracias’ বার্তা দিয়ে তাকে সম্মান জানানো হয়। জাতীয় সংগীতের সময় তিন ছেলে পাশে থাকতেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেসি। মাঠে থাকা কোচ লিওনেল স্কালোনিও ছিলেন আবেগাপ্লুত।
খেলা শুরু হওয়ার পরও স্পষ্ট ছিল, সেদিনের মূল চরিত্র একজনই—মেসি। ম্যাচের ১০ মিনিটে বিশেষভাবে খেলা থামিয়ে তাকে সম্মান জানায় মনুমেন্টালের দর্শকরা। পুরো গ্যালারি দাঁড়িয়ে মেসির নাম ধরে স্লোগান দিতে থাকে, সঙ্গে ছিল আতশবাজির প্রদর্শনী। এরপর মাঠে ফিরে আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে থাকে। বেনিন রক্ষণাত্মক অবস্থানে থাকলেও মেসি বারবার আক্রমণে যুক্ত হচ্ছিলেন। কখনো পাস দিয়ে, কখনো সেট-পিসে, আবার কখনো নিজেই গোলের চেষ্টা করে তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন—শেষ ম্যাচ হলেও তার সৃষ্টিশীলতায় কোনো ঘাটতি নেই। বিদায়ের ম্যাচটিও তাই মেসির স্বাভাবিক ফুটবল-পরিচয়েরই আরেকটি অধ্যায় হয়ে উঠতে শুরু করে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আসে আর্জেন্টিনার প্রথম গোল। ৪৮ মিনিটে মেসির নেওয়া কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দি কাছ থেকে বল জালে পাঠিয়ে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন। এই গোলের মাধ্যমে মেসি জাতীয় দলের হয়ে আরও একটি অ্যাসিস্ট যোগ করেন নিজের নামের পাশে। এরপর আর্জেন্টিনার আক্রমণ আরও ধারালো হয়ে ওঠে। ৬১ মিনিটে আবারও মেসির পায়ের জাদু দেখা যায়। বক্সের বাইরে থেকে নিকো পাজকে বল বাড়িয়ে দেন তিনি, আর পাজ দারুণ শটে বেনিনের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে ব্যবধান ২–০ করেন। অর্থাৎ বিদায়ের রাতেও মেসি গোল না করেও ম্যাচের দুই গোলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যান।
এরপর অপেক্ষা ছিল শুধু একটি মুহূর্তের—জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির শেষ গোলের। সেই মুহূর্ত আসে ম্যাচের ৭০ মিনিটে। বেনিনের বক্সে ফাউলের পর পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। স্পট-কিক নেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নেন মেসি। চাপের সেই মুহূর্তে ঠান্ডা মাথায় বল পাঠিয়ে দেন গোলের উপরের কোণে। গোলরক্ষকের কোনো সুযোগই ছিল না। গোলের পর মেসিকে ঘিরে সতীর্থদের উচ্ছ্বাস আর গ্যালারিতে দর্শকদের উদযাপন মুহূর্তটিকে আরও স্মরণীয় করে তোলে। শেষ ম্যাচে গোল, তার সঙ্গে দুই অ্যাসিস্ট—জাতীয় দলের হয়ে নিজের শেষ রাতটিকেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে স্মরণীয় করে রাখেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
শেষদিকে আরও একবার গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন মেসি। ৮৯ মিনিটে তার শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে ফ্রি-কিক থেকেও গোল করার চেষ্টা করেন তিনি, কিন্তু বল চলে যায় পোস্টের ওপর দিয়ে। এরপরই যেন সময় থেমে যায়। রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়ে যায় আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। বেনিনের বিপক্ষে ৩–০ জয়টি স্কোরলাইনে হয়তো আর দশটি ম্যাচের মতোই একটি জয়, কিন্তু আর্জেন্টাইনদের কাছে এটি হয়ে থাকে একটি যুগের সমাপ্তি। মাঠে থাকা বেনিনের খেলোয়াড়রাও ম্যাচ শেষে মেসির সঙ্গে ছবি তুলতে এগিয়ে আসেন।
মেসির বিদায়ের রাতে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অর্জনগুলোও নতুন করে সামনে আসে। ২০০৫ সালে অভিষেকের পর দুই দশকেরও বেশি সময় আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছেন তিনি। তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা জিতেছে ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফাইনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপ। জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতা হিসেবেও বিদায় নিলেন তিনি। শেষ ম্যাচে বেনিনের বিপক্ষে দুই অ্যাসিস্ট ও এক গোল যোগ করে মেসি আরও একবার দেখিয়ে দিলেন, কেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসে তার নাম আলাদা করে লেখা থাকবে। তার বিদায় শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়, আর্জেন্টিনার ফুটবলের সবচেয়ে সফল এক অধ্যায়ের সমাপ্তি।
মনুমেন্টালে তাই শেষ পর্যন্ত ফলাফল ৩–০ হলেও আসল উদযাপন ছিল একজন কিংবদন্তিকে ঘিরে। মেসি মাঠ ছাড়ার সময় গ্যালারিজুড়ে ছিল তার নামের ধ্বনি, চোখে ছিল অশ্রু আর মনে ছিল অসংখ্য স্মৃতি। যে খেলোয়াড়ের সঙ্গে আর্জেন্টিনা একাধিক প্রজন্মের স্বপ্ন, হতাশা ও সাফল্য ভাগ করে নিয়েছে, তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটিও শেষ হলো জয় দিয়ে। ওতামেন্দির গোলের জন্য কর্নার, নিকো পাজের গোলের জন্য নিখুঁত পাস এবং নিজের পেনাল্টি—তিন গোলেই মেসির সরাসরি অবদান। ফলে বেনিনকে ৩–০ গোলে হারিয়ে শুধু একটি ম্যাচ জেতেনি আর্জেন্টিনা; তারা বিদায় জানিয়েছে তাদের সবচেয়ে বড় ফুটবল-প্রতীককে, এমন এক রাতে যা আর্জেন্টাইন ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
