চার লেনের স্বপ্নের পথেই এখন দুর্ভোগ, ধুলা-গর্তে নাকাল লক্ষ্মীপুরবাসী
চার লেন সড়কের নির্মাণকাজ চলায় ধুলাবালি ও গর্তে ভোগান্তিতে লক্ষ্মীপুরের মানুষ।
লক্ষ্মীপুরে বহুদিনের প্রত্যাশিত চার লেনের সড়ক নির্মাণ শুরু হলেও নির্মাণকাজের কারণে আপাতত বেড়েছে জনদুর্ভোগ। কোথাও বড় বড় গর্তে জমছে বৃষ্টির পানি, কোথাও শুকিয়ে যাওয়া কাদা থেকে উড়ছে ধুলাবালি। এতে যাত্রী, চালক, পথচারী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিদিনই ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে।
ঢাকা-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছে চলতি বছর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। ৫৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৯ সালে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর কাজ শুরু হলেও নির্মাণাধীন অংশে পুরোনো দুই লেনের সড়কটি চলাচলের উপযোগী রাখতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ভোগ বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সড়কের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হওয়া খানাখন্দে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। পানি শুকিয়ে গেলে কাদায় ভরে যাচ্ছে সড়ক, আর কাদা শুকিয়ে গেলে যানবাহনের চাকার সঙ্গে ধুলাবালি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে পথচারী, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, যাত্রী ও পরিবহন চালকদের প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচলকারী দূরপাল্লার যানবাহনগুলোকে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে। এতে সময় বাড়ার পাশাপাশি যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে চালকদের অভিযোগ।
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসনের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের বেহাল দশা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পানিসম্পদ মন্ত্রী ও লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী। জনদুর্ভোগ কমাতে দ্রুত সড়ক সংস্কারের জন্য লক্ষ্মীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন তিনি।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্দেশনার পরও সড়কের পুরো অংশে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। বিশেষ করে ধুলা নিয়ন্ত্রণ ও গর্ত সংস্কারে আরও কার্যকর উদ্যোগ খুবই প্রয়োজন।
জকসিন, মান্দারী, জেলা কারাগার সংলগ্ন এলাকা ও শহরের বাগবাড়ী এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, নির্মাণাধীন সড়কে নিয়মিত পানি ছিটাতে দেখা যায় না। ফলে বাতাসে উড়ে আসা ধুলায় দোকানের খাবার, মালামাল ও আসবাবপত্র নষ্ট হচ্ছে। ধুলার কারণে বেচাকেনাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সড়কের দুই পাশের বাসাবাড়িতেও একই অবস্থা। ঘরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে কাপড়চোপড় ও অন্যান্য সামগ্রীতে ধুলা জমছে।
পরিবেশবাদীদের ভাষ্য, নির্মাণকাজ চলাকালে ধুলাদূষণ নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানোসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
শুধু ধুলাবালি নয়, সড়কের খানাখন্দও চালকদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় গর্তে পড়ে প্রায়ই যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও গাড়ি বিকল হয়ে সড়কের ওপর পড়ে থাকায় তৈরি হচ্ছে যানজট।
শনিবার দুপুরে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার জকসিন সংলগ্ন একটি পেট্রোল পাম্প এলাকায় সড়কের ওপর সারবাহী একটি পিকআপ ভ্যান পড়ে থাকতে দেখা যায়।
চালক কামরুল ইসলাম বলেন, বেগমগঞ্জের বাংলাবাজার থেকে সার নিয়ে লক্ষ্মীপুর শহরে আসার পথে জকসিন বাজার এলাকায় পিকআপটির এক্সেল ভেঙে যায়। একই মালিকের আরও দুটি পিকআপ হাজীরপাড়া ও চন্দ্রগঞ্জের আন্ডারঘর এলাকায় নষ্ট হয়ে সড়কে পড়ে আছে বলেও জানান তিনি।
রায়পুর কাজী ফারুকী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীবাহী বাসের চালক বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৪৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়। ধুলাবালিতে শিক্ষার্থীদের স্কুলড্রেস নষ্ট হচ্ছে। গর্তে পড়ে বাসের বিভিন্ন যন্ত্রাংশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তার ভাষ্য, চার লেনের নির্মাণকাজ দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় পুরোনো সড়কটি অন্তত চলাচলের উপযোগী রাখতে নিয়মিত সংস্কার করা প্রয়োজন।
মোটরসাইকেল আরোহী মো. শিপন বলেন, দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত চার লেনের কাজ শুরু হয়েছে, এটি ভালো খবর। কিন্তু নির্মাণাধীন সড়কের পাশের দুই লেন এখন চলাচলের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বড় গর্ত ও ধুলাবালির কারণে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে ধুলায় যাদের অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের সমস্যা বেশি।
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার সড়ক দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পটি পাঁচটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। চার লেনের সড়কটির প্রস্থ হবে ২০ মিটার।
লক্ষ্মীপুর অংশের প্রায় ১৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে দুটি প্যাকেজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২৯ কোটি টাকা। চন্দ্রগঞ্জ বাজার থেকে মান্দারী বাজার পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার অংশের কাজ পেয়েছে রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড বিল্ডার্স। আর মান্দারী থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার অংশের কাজ পেয়েছে তাহের ব্রাদার্স।
নোয়াখালী অংশের প্রায় ১১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে তিনটি প্যাকেজে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দুটি প্যাকেজের কাজ পেয়েছে রিলায়েবল বিল্ডার্স। জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতায় একটি প্যাকেজের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
যাত্রী ও চালকদের অভিযোগ, সড়কের বর্তমান অবস্থার কারণে আগের তুলনায় যাতায়াতে সময় বেড়েছে। ধীরগতিতে যান চলাচলের কারণে কোনো কোনো রুটে ভাড়াও বেড়েছে। কোথাও কোথাও ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
ধুলাবালির কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অরূপ পাল বলেন, দূষিত বায়ু ও ধুলাবালি নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করলে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, হাঁপানি, জ্বর-সর্দি ও ফুসফুসে সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্রতিদিনই এ ধরনের সমস্যা নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে আসছেন।
ধুলাবালিযুক্ত সড়কে চলাচলের সময় মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।
তবে ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো হচ্ছে না—এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চন্দ্রগঞ্জ থেকে মান্দারী পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার অংশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড বিল্ডার্সের প্রকল্প ব্যবস্থাপক এমডি ইউছুফ।
তিনি বলেন, দুটি পানিবাহী গাড়ি নিয়মিত সড়কে পানি ছিটাচ্ছে। পুরোনো সড়ক মেরামতের কাজ ওয়ার্ক অর্ডারে না থাকলেও যান চলাচলের সুবিধার্থে যতটুকু সম্ভব মেরামত করা হচ্ছে।
তবে সরেজমিনে সড়কের পুরো অংশে পানি ছিটানোর কোনো পানিবাহী গাড়ি দেখা যায়নি।
সড়ক বিভাগ বলছে, নির্মাণকাজ চললেও যানবাহন চলাচলের উপযোগী সড়ক ব্যবস্থাপনা, ধুলা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।
নোয়াখালী উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আহসান উল্যা মজুমদার বলেন, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত ও জনদুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লক্ষ্মীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, চার লেন নির্মাণকাজের যেখানে প্রয়োজন সেখানে পানি ছিটাতে হয়। তবে অতিরিক্ত পানি ছিটালে নির্মাণকাজে ক্ষতি হতে পারে। সড়কের গর্তগুলো ঠিকাদারদের দিয়েই সংস্কার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, চার লেনের কাজ শেষ হলে যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও শিক্ষা খাতসহ লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন হবে।
বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত চার লেনের সড়ক এখন নির্মাণাধীন। তবে পুরো প্রকল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরোনো সড়ক দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে মানুষকে। সেই সড়কটি চলাচলের উপযোগী রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় চার লেনের স্বপ্নের পাশাপাশি প্রতিদিনের দুর্ভোগও দীর্ঘ হচ্ছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
